Monday, February 15, 2016

সাবেক এক সেনা কর্মকর্তার ইউপিডিএফনামা ও পার্বত্য চট্টগ্রাম সমস্যা

অবসরপ্রাপ্ত সেনাকর্মকর্তা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল এম সাখাওয়াত হোসেন দীর্ঘ সাত বছর পরে পার্বত্য চট্টগ্রাম ভ্রমণ করেছেন এবং তিনি ভ্রমণের পরে যা দেখেছেন বা পার্বত্য সমস্যা নিয়ে তিনি যা মনে করেন তা নিয়ে তিনি স্বনামধন্য দৈনিক প্রথম আলো পত্রিকায় একটি ছোটো আকারের প্রবন্ধ লিখেছেন। প্রবন্ধটি প্রথম আলো পত্রিকার ০৯ ফেব্রুয়ারি সংখ্যায় মতামত বিভাগ বা উপসম্পাদকীয় কলামে প্রকাশ করা হয়েছে।
প্রবন্ধটিতে তিনি তার ভ্রমণ বৃত্তান্ত বর্ণনা করেননি। তবে বলা যায় পার্বত্য চট্টগ্রাম সমস্যা নিয়েই তিনি আলোকপাত করার চেষ্টা করেছেন এবং নিজস্ব একটি সিদ্ধান্ত বা সমস্যা সমাধানমূলক সারসংক্ষেপ টানতে চেষ্টা করেছেন। তিনি মূলত ১৯৯৭ সালের ০২ ডিসেম্বর পার্বত্য চুক্তি স্বাক্ষর পূর্ববর্তী প্রেক্ষাপটের সাথে বর্তমান প্রেক্ষাপটের কিছুটা তুলনা করে তার মতামত প্রদান করেছেন। তার লেখা থেকেই আমি কিছু উদ্ধৃতি দিচ্ছি।
খাগড়াছড়ি জেলা থেকে রাঙামাটি হয়ে কাপ্তাই উপজেলার বাঙালহালিয়া ভেদ করে যে রাস্তা রাঙামাটিতে গিয়েছে তার বর্তমান অবস্থা বিশ্লেষণ করে তিনি লিখেছেন-
রাস্তাটির নির্মাণকাজ নব্বইয়ের দশকে শেষ হয়েছিল, কিন্তু তখন পার্বত্য চট্টগ্রামের অশান্ত পরিস্থিতির প্রেক্ষাপটে সেটা খুব ব্যবহার করা হতো না। ১৯৯৭ সালের পার্বত্য চুক্তির পর পার্বত্য চট্টগ্রামের পরিস্থিতি অনেকটা পাল্টে যায়। ফলে এখন এ রাস্তা কার্যকর বলে বিবেচিত। পার্বত্য চট্টগ্রামের তিন জেলার সর্বসাধারণের এখন চট্টগ্রাম ঘুরে নয়, সরাসরি যোগাযোগ করা সম্ভব হয়েছে।
অর্থাৎ, পার্বত্য চুক্তি সম্পাদনের মাধ্যমে পার্বত্য অঞ্চলের একটি আপাত শান্তিপূর্ণ পরিস্থিতি বিরাজ করছে এবং সে এলাকায় অর্থনৈতিক বা যেকোন প্রকারের উন্নয় বলি না কেন তা বৃদ্ধি পাচ্ছে। তিনি লিখেছেন-
১৯৯০-৯২-এ কর্তব্যরত ছিলাম বান্দরবান সেনা রিজিয়নে, কমান্ডার হিসেবে। ওই সময় পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি সশস্ত্র সংগ্রামে লিপ্ত ছিল। তাদের বিরুদ্ধে সেনা অভিযান চলছিল। পার্বত্য চুক্তি অন্তত সে পরিস্থিতির ইতি টেনেছে।
তিনি লিখেছেন-
যোগাযোগ অবকাঠামোর সঙ্গে বাজারব্যবস্থার যেমন উন্নতি হয়েছে, তেমনি পার্বত্য চট্টগ্রাম, বিশেষ করে দক্ষিণের জেলা বান্দরবানে পর্যটনের যে দ্বার উন্মুক্ত হয়েছে, তা অচিন্তনীয় ছিল। নব্বইয়ের দশকের প্রথম দিকে যে কয়েকটি জায়গা পর্যটনের উপযোগী করে তোলার চেষ্টা করা হয়েছিল, আজ সেসব জায়গায় প্রতিদিন শত শত লোকের পদচারণ। বাংলাদেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে এদের সমাগম। পর্যটনকে কেন্দ্র করে আশপাশের উপজাতীয় গ্রামগুলোতে হস্তশিল্প গড়ে উঠেছে। পার্বত্য চট্টগ্রাম এখন দেশের অভ্যন্তরীণ পর্যটনের প্রধান কেন্দ্র। এরই প্রেক্ষাপটে স্থানীয়ভাবে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে স্থানীয় বাসিন্দারা।
আমাকে লেখকের বা প্রবন্ধকারের উদ্ধৃতি একটু বেশি করেই দিতে হচ্ছে তার কারণ এতে তার লেখায় তিনি যা বলেছেন বা বলতে চেয়েছেন তা বেশি মাত্রায় স্পষ্ট হবে। এছাড়া আসলে তিনি যা বলেছেন তা-ই যেহেতু আলোচনার মুখ্য বিষয় সেহেতু তার আলোচনার বিষয়বস্তু আগে পাঠকদের জানা দরকার বলেই প্রতীয়মান। সে বিষয় বাদে আমার যা বক্তব্য বা যা মত তা সাধারণভাবে বিষয়কে, মাথাটি মাটির দিকে বা মাধ্যাকর্ষনের উল্টো দিকে না রেখে তা আকাশের দিকে বা যেভাবে থাকা স্বাভাবিক সেদিকে স্থাপন করার প্রচেষ্টাটাই মূখ্যকাজ হিসেবে বিবেচিত করছি মাত্র।
যা-ই হোক, এরপর তিনি তার লেখায় পার্বত্য এলাকায় শিক্ষার উন্নয়নের একটি চিত্র উপস্থাপনের চেষ্টা করেছেন। এই প্রসঙ্গ নিয়ে আলোচনার প্রাক্কালে তিনি তার প্রবন্ধের প্রধান বিষয়বস্তুকে সামনে আনার চেষ্টা করেছেন। তিনি লিখেছেন-
বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপন নিয়ে জনসংহতি সমিতি ও ইউপিডিএফের বিরোধিতা ছিল।
তবে কেন ও কী কারণে এই দুই রাজনৈতিক দল ‘বিশ্ববিদ্যালয়’ স্থাপন নিয়ে ‘বিরোধিতা’ করেছিল তা নিয়ে তিনি আলোকপাত করেননি। সম্ভবত তাতে তার আলোচনার মোড় তিনি যেদিকে নিতে চাচ্ছেন তা ফিরে যাবে বা তার গতি অন্যদিকে যাবে বলে তিনি সে আলোচনায় যাননি!
এখানে বলা দরকার উপস্থানার মাধ্যমে তিনি দুই পার্বত্য রাজনৈতিক দলকে ‘শিক্ষার উন্নয়ন বিরোধী’ হিসেবে চিত্রিত করার সচেতন প্রয়াস না করলেও বক্তব্যের অন্তঃধ্বনি বা লুক্কায়িত থাকা বক্তব্যটি যে সেটিরই আভাস দেয় তা যারা পাঠক তারা সেভাবেই বুঝবেন বলেই বোধে আসে বলে প্রতীয়মান।
এখানে বলা দরকার যে, দুই রাজনৈতিক দল ‘বিশ্ববিদ্যালয়’ নয় বরং মেডিক্যাল এবং বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনের বিরোধিতা করেছে। এবং এই বিরোধিতার অন্যতম কারণ হলো, পার্বত্য জুম্ম জনগণের ‘রাজনৈতিক অধিকার’কে পাশ কাটিয়ে যাওয়ার সরকারী যে ‘অপচেষ্টা’ তা তুলে ধরার  প্রচেষ্টা চালানো। সরকার, তা আওয়ামীলীগ বা বিএনপি বা মহাজোট বা ১৪ দলীয় জোট বা ২০ দলীয় জোট যারাই হোক না কেন, তারা যে সবসময় একই তালে পার্বত্য জুম্ম জনগণকে রাজনৈতিকভাবে ক্রমাগত দুর্বলতর করারই চেষ্টা করে যাচ্ছে সেদিকটি নিয়ে সমাধানের উদ্যোগ না নিয়ে পার্বত্য জুম্ম জনগণকে ‘রাজা বাদশার হালে’ রাখলেও বা তাদের ‘সোনায় মুড়িয়ে দিলেও’ তারা যে পিঞ্জরাবদ্ধ ‘সোনার পাখি’ মাত্র তা তো বলা বাহুল্যমাত্র! সরকার একদিকে তিন পার্বত্য জেলা পরিষদকে অকার্যকর করে রেখেছে, কায়েম করেছে স্বার্থবাজ ধান্ধাবাজদের রাজত্ব। অন্যদিকে চুক্তি বাস্তবায়নের ’মেগা সিরিয়াল’ প্রদর্শন করে যাচ্ছে ক্রমাগত।
পার্বত্য চট্টগ্রামে শিক্ষার বেহাল দশার পেছনে সরকারের জুম্ম ধ্বংসের নীতি যে কার্যকর রাখা হয়েছে তা নিয়ে আলাদাভাবে লেখা দরকার বলে মনেকরি।এখানে সে আলোচনা বাড়তি প্রসঙ্গ যোগ করবে মাত্র।
তবে এরপর ব্রিগেডিয়ার সাখাওয়াত হোসেন অন্য আলোচনার পাশাপাশি প্রাসঙ্গিক বা অপ্রাসঙ্গিকভাবে ‘ইউপিডিএফ’এর নামটি এনেছেন। এবং আমার মূল আলোচনা আমি সেখানেই নিবদ্ধ করার চেষ্টা করবো।
তিনি ইউপিডিএফ বা ইউনাটেড পিপলস ডেমোক্রেটিক ফ্রন্ট নিয়ে যা যা বলেছেন তা আমি তুলে ধরছি।
১. অতীতে যেমন ছিল, বর্তমানে সমগ্র দেশের তুলনায় সমগ্র পার্বত্য চট্টগ্রামের সামাজিক ও সার্বিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি অনেক ভালো। তবে ইউপিডিএফ নামে যে গোষ্ঠীটি পার্বত্য চুক্তির বিরোধী, তাদের তৎপরতা ক্রমান্বয়ে বৃদ্ধি পাচ্ছে। বছরে প্রায় ৫০০ কোটি টাকার বলপূর্বক চাঁদা তোলার ঘটনা ঘটছে। ফলে প্রত্যন্ত অঞ্চলের জনজীবন অতিষ্ঠ।
২. পার্বত্য চট্টগ্রামের বর্তমান পরিস্থিতি অতীতের তুলনায় যথেষ্ট স্থিতিশীল। তবে নতুন উপসর্গ ইউপিডিএফের নামে সংঘটিত সশস্ত্র তৎপরতাকে রাজনৈতিক ও স্থানীয়ভাবে মোকাবিলা করতে না পারলে পরিস্থিতি অস্বস্তিকর হতে পারে।
ইউপিডিএফ সম্পর্কে তিনি এতকথা বলার পরে তার প্রবন্ধের সমাপ্তি রেখায় ‘আশার বাণী’ নিশ্চয়ই টেনেছেন! তিনি বলছেন- উসকানিমূলক বক্তব্য বা কর্মকাণ্ড নয়, সম্প্রীতি আর সৌহার্দ্যের মাধ্যমে অনেক জটিল বিষয়ের সুরাহা সম্ভব।
তবে তার এই ইউপিডিএফ নামা’র মাধ্যমে তিনি ‘সম্প্রীত ও সৌহার্দ্য’ কতটা দেখিয়েছেন এবং ‘উসকানিমূলক বক্তব্য বা কর্মকান্ড’ই বা কতটা না বলেছেন তা নিয়ে আমরা বিতর্কে যেতে পারি বটে!
ইউপিডিএফ বিষয়ে ব্রিগেডিয়ার সাখাওয়াত হোসেনের বক্তব্য নিয়ে আলোচনার আগে আমি তার আগে করা উদ্ধৃতি বিষয়ে আগে দুয়েকটি কথা বলি। তবে বলা দরকার যে, আমার এই লেখা যেহেতু কোন প্রিন্ট মিডিয়ায় প্রকাশ হবার সম্ভাবনা নেই এবং সাধারণভাবে এই ধরণের লেখা যেহেতু মূলধারার গণমাধ্যমে প্রকাশ করা হয় না সেহেতু আমি সাধারণভাবে একটু রিল্যাক্স মুডে লেখা লিখে থাকি। রিল্যাক্স মুডে মানে হলো, লেখাটি এতটা ’স্ট্যান্ডার্ড’ বা মানসম্পন্ন না করলেও চলে!
ব্রিগেডিয়ার সাখাওয়াত হোসেন তার লেখার প্রথমে পার্বত্য চট্টগ্রামের যোগাযোগ ব্যবস্থা তথা অর্থনৈতিক উন্নয়ন নিয়ে গুণগান করেছেন। কিন্তু আদতেই অর্থনৈতিক উন্নয়নের মাধ্যমে যদি পার্বত্য সমস্যার সমাধান হয়েছে এই সিদ্ধান্তে তিনি পৌঁছাতে চান বা তাঁর আগেও সামরিক শাসক জিয়াউর রহমান যেমন পার্বত্য সমস্যাকে অর্থনৈতিক সমস্যা হিসেবে চিহ্নিত করে তার সমাধানের উদ্যোগ নিয়েও সম্ভব করে উঠতে পারেননি, সেই একই কথার চর্বিতচর্বন করতে চান তবে তাতে আমার বা আমাদের বলার মতো তেমন থাকে না বলেই মনেহয়!
সুতরাং, এই পুরোনো কিন্তু ছাঁচে ঢালা বক্তব্যে পার্বত্য সমস্যার রাজনৈতিক সমাধানের যে টিকিটিও নাগাল পাওয়া যাবে না তা তিনি জেনেশুনে যদি বলে থাকেন ভিন্ন কথা! কারণ, ১৯৯৭ সালে পার্বত্য চুক্তি করে জেএসএসএর অস্ত্রসমর্পন করানোর শাসকশ্রেনীর মতলব বা উদ্দেশ্য ছিলই তো, জুম্ম জনতার রাজনৈতিক অধিকার আদায়ের পাটাতনকে সরিয়ে নেয়া!
কিন্তু, সরকার প্রধান যখন বলেন মিলিটারির মাধ্যমে পার্বত্য সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়,  তখন পুরোনো সেই ’মিলিটারির মাধ্যমে’ দমনপীড়ন চালিয়ে এবং ‘অর্থনৈতিক উন্নয়ন’ করে বা ‘উন্নয়ন বোর্ড’ বানিয়ে দিয়ে পার্বত্য চট্টগ্রামের ’শান্তি’ স্থাপন করার দাওয়াই যখন কোনো অবসরপ্রাপ্ত সামরিক কর্মকর্তা প্রদান করেন তখন আমাদের একটু অবাক বিস্মিত হতে হয় বৈকি!
এবার আসি ইউপিডিএফ প্রসঙ্গে। তিনি বলেছেন, ইউপিডিএফ বছরে ৫০০ কোটি টাকার চাঁদাবাজি করে থাকে। তবে কোন সূত্র থেকে তিনি একথা বলেছেন তা তিনি উল্লেখ করেননি। এবং একটি সক্রিয় গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক সংগঠন বিষয়ে একটি প্রগতিশীল দৈনিকে এধরণের সূত্র উল্লেখ বিহীন তথ্য বা ডাটা থাকলেও তাতে পত্রিকাটির ‘সম্পাদকীয় নীতিমালা’র লাভক্ষতি বা নীতির গতি পরিমাপরে ক্ষেত্রে কোনো হেরফের হয় না বা হবে না বলাই যায়! কেননা, পার্বত্য চট্টগ্রামের স্বতন্ত্র রাজনৈতিক চেতনাকে দমানোর নীতি যখন ‘প্রায়োরিটি’র বিষয় তখন তাতে ঘি ঢালাই তো মূলধারার গণমাধ্যমের কর্তব্য করণীয় হিসেবে নির্ধারিত!
যেকোনো প্রকারে হোক পার্বত্য চট্টগ্রামের স্বতন্ত্র রাজনৈতিক চেতনাকে যখন রূদ্ধ করার বা দমন করার নীতি সামনে এসে হাজির হয় তখন কে কি করেছে বা করছে বা কোন সংগঠন কী করছে না করছে তা মুখ্য নয়, বরং, বাঘ ও হরিণের সেই গল্পটির ছড়ায় পানি পান করার মতো বাঘকে যে যুক্তিসম্পন্ন না হলেও বা ছলে না হলেও বলে বা শক্তি প্রদর্শন করে যে হরিণকে ’ভক্ষণ’ করতে হবে তা তো উদাহরণ হিসেবেই রয়েছে!
তবে আশার কথা(!) হলো, ব্রিগেডিয়ার সাখাওয়াত হোসেন ‘নতুন উপসর্গ ইউপিডিএফের নামে সংঘটিত সশস্ত্র ৎপরতাকে(বোল্ড মন্তব্য প্রদানকারী লেখকের) রাজনৈতিক ও স্থানীয়ভাবে মোকাবিলা’ করার কথা বলেছেন!
ব্রিগেডিয়ার সাখাওয়াত হোসেনের লেখাটি নিয়ে আলোচনা করতে হল এ কারণে যে, তিনি সাধারণভাবে একজন ’ক্লিন ইমেজের’ সেনা কর্মকর্তা হিসেবে এবং একজন সজ্জ্বন ব্যক্তি হিসেবেও দেশে পরিচিত।সুতরাং তিনি যখন কোনো মন্তব্য বা মত প্রকাশ করেন তখন তার গুরুত্ব থাকা প্রয়োজন এবং দেয়া প্রয়োজন। সেনাবাহিনীতে কাজ করার কারণে তিনি পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ে যে চিন্তা ভাবনা করেন তা যে দেশের সেনাবাহিনীতে কর্মরত বর্তমান ও সাবেক ধিকাংশ জনের সাথে মিলে থাকবে তাও নিশ্চয় বিবেচনায় নিতে হয়। তার লেখা নিশ্চয়ই আরো অনেকে পড়েছেন এবং তাতে বর্তমান সমস্যা কিভাবে মোকাবেলা করা যায় তা নিয়ে ‘ক্লু’ যে অনেকে পাবেন তা বলা যায়। এছাড়া আরেকটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ যে, বর্তমান সরকার বা এর আগের ও কোনো সরকারই ‘জাতীয় নিরাপত্ত নীতি’ নিয়ে কোনো ধরণের ‘নীতিমালা’ নির্ধারণ করেনি। তাতে দেখা যায়, ব্যক্তিবিশেষের মতামত বা চিন্তাধারার প্রাধান্য সরকারের নীতিমালা ঠিক করতে অনেকসময় প্রাধান্য পেয়ে থাকে। এবং এখনো পর্যন্ত ‘আধিপত্যবাদী’ ধ্যানধারণা বা দৃষ্টিকোণ থেকেই সরকারী শাসক পর্যায়ের নীতি নির্ধারক মহল পার্বত্য সমস্যা নিয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে বলেই আমাদের কাছে প্রতীয়মান হয়।
সেদিক থেকে আমরা শুধু এটাই আশা করবো যে, সরকার বা শাসকশ্রেনী এই ‘আধিপত্যবাদী ধ্যান ধারণা’ থেকে বেরিয়ে আসবে!
পাদটীকাঃ আমার লেখায় আমি ইউপিডিএফ নিয়ে আলোচনা করিনি।বরং পার্বত্য সমস্যা নিয়ে শাসক মহলের বা শাসকশ্রেনীর নানা অংশের ‘আধিপত্যবাদী’ দৃষ্টিভঙ্গি ও ভ্রান্ত দৃষ্টিভঙ্গি যে রয়েছে তা নিয়ে  আলোচনা সীমাবদ্ধ রাখার চেষ্টা করা হয়েছে।

Tuesday, February 9, 2016

সিরাজ সিকদারের সর্বহারা পার্টিঃ প্রেক্ষিত পার্বত্য চট্টগ্রাম

তারিখঃ ১২ জানুয়ারি, ২০১৬
মিঠুন চাকমা
পারিবারিক অভিজ্ঞতা জ্ঞাপন
আমার দাদীর বাড়ি রাঙামাটির লুঙুদু উপজেলার মাহজনপাড়া গ্রামে।বলে রাখি তিনি লেখাপড়া করেননি।তার সময়ে মেয়েদের লেখাপড়া করা বারণ ছিল। তাই সবাই স্কুলে যাবার সময়ে তিনি হয় রান্নাঘরের চুলা সামলাতে মায়ের সহকারী হয়েছেন নতুবা ঘরের নানা কাজে সহযোগিতা করেছেন।তার সাথে আলাপ করার সময় তার বাপের বাড়িতে ঘটা একটি ঘটনার কথা তিনি স্মরণ করছিলেন।তখন তিনি দাদুর বাড়িতে স্ত্রী হিসেবে চলে এসেছেন এবং কয়েকজন ছেলেপিলেও তার হয়েছে।একদিন তিনি জানতে পারেন তাদের গ্রামে তার পিতার ঘর  ‘সর্বহারা’রা লুট করেছে। সর্বহারা নামে যারা এই ঘটনা ঘেটিয়েছিল তারা লুট করেছিল ধানের গোলা থেকে ধান, টাকা পয়সা যা ছিল ও তাদের ঘরে যে সকল কাপড়চোপড় ছিল সবকিছু।তিনি জানাচ্ছিলেন, তার মা বেশ কষ্ট করে বেইন বুনে বুনে পিনন ও খাদি (চাকমা নারীদের পরনের পরিধান)বুনতেন। এবং তা একটি পুটলি বা বোাঁচকায় রেখে দিতেন। সর্বহারা’রা যেদিন লুট করতে আসল সেদিন তার মা পিনন ও খাদি’র সেই পুটলি যেন লুটের হাত থেকে বাাঁচাতে পারেন তার জন্য তা ঘরের বাইরে পাহাড়ের নিচে ছুড়ে দিয়েছিলেন। কিন্তু সর্বহারা’রা তাও কুড়িয়ে নিয়ে যায়। লুটের পরে তার মায়ের পড়নের কাপড় ছাড়া কিছুই ছিল না। তাকে অন্যজন থেকে কাপড় চেয়ে নিতে হয়েছিল। পরে তিনি নিজে তার মায়ের জন্য পিনন বা পরনের কাপড় পাঠিয়ে দেন।
সর্বহারারা কেন মাহজনপাড়া গ্রামে আমার দাদী’র পিতার বাড়ি লুট করেছিল? এ বিষয়ে দাদী কিছু্ই বলতে পারেননি। কারণ তিনি কীই বা বুঝবেন শ্রেনীশত্রু-মহাজন শ্রেনী বিষয়ে! আমি তো অবাক হই এতদিন পরে তিনি কিভাবে এই ‘সর্বহারা’ শব্দটি মনে রাখতে পারলেন তা নিয়ে!
আদতে দাদী বা তাদের পিতার পরিবার কি বড়সড় কোনো জমিদার কেউ ছিলেন? অথবা ছিলেন অত্যাচারী জমিদার, জোতদার?
ধনসম্পত্তির দিক থেকে হয়ত তাদের অন্যজনের চেয়ে ভালো অবস্থান ছিল। কিন্তু পার্বত্য চট্টগ্রামের তৎকালীন প্রেক্ষাপটে ধনী বা জমিদার বলতে যা বোঝায় তা হল, ‘বজরঅ ভাদে পারানা’ বা একুনে ধানের যা উৎপাদন তা দিয়ে পুরো একটি বছর কাটিয়ে দিতে পারাই হলো তৎকালীন সময়ে ধনী বা থাউইএ(চাঙমা ভাষায় ধনী অর্থে বোঝাতে) বা জমিদার হিসেবে পরিচিতির বৈশিষ্ট্য।কিন্তু এটাও ঠিক যে এই জমিদার বা ধনী বা চাকমা ভাষায় থাউইএ শ্রেনীর লোকজনকে তাদের নিজেদের জমিতে নিজেদের গতরও খাটতে হতো।তারা বা এই শ্রেনী কাউকে অত্যাচার করতো কি না তা খুঁজতে হলে পাই পাই করে প্রতিজনের বিষয়ে বাস্তব ধারণা নিতে হবে। কিন্তু তারপরেও কি শ্রমিক শ্রেনীর কমিউনিস্ট বা বিপ্লবী রাজনীতিতে এই ‘মাঝারী ধনী’ বা ‘স্বচ্ছল ধ্বনী’ক শ্রেনীকে ‘শ্রেনীশত্রু’ তকমায় ফেলা যায়?
সম্ভবত, চীনে মাও সেতুঙের পিতা তারও চেয়ে অধিক ধনী বা বিত্তবান বা অধিক জমিদার ছিলেন। কিন্তু মাও সেতুঙ কি এই শ্রেনীকে ‘শত্রু’র কাতারে ফেলেছিলেন?
সর্বহারা পার্টি’র ‘পূর্ব বাংলার সমাজের শ্রেনী বিশ্লেষণ’ লেখাটি পড়লে বোঝা যাবে ‘দাদী’র পিতা কোন শ্রেনীতে পড়তেন। সম্ভবত, তারা বড়জোর ধনীক শ্রেনীর কাতারে অন্তর্ভুক্ত হতে পারেন।তবে ধনীক শ্রেনীর কাতারে পড়বেন কি না তা নিয়েও সন্দেহ রয়েছে। দাদী বলেছেন, তার পিতা খুব কষ্ট করে নিজে পরিশ্রম করে ‘আগাব ভুঁই’ চাষ অযোগ্য জমির মাটি কেটে কেটে চাষাবাদযোগ্য জমি প্রস্তুত করেছেন। খেটে খেটে জমির পরিমাণ বাড়িয়েছেন। এবং জমিতে তিনি যেমন মজুর নিয়োগ করতেন তেমনি নিজেও জমিতে শ্রম দিতেন। পরে তিনি এলাকায় মহাজন হিসেবে পরিচিতি লাভ করেন।
এই শ্রেনী সম্পর্কে বলা হচ্ছে-
‘সাধারণভাবে বলতে গেলে তারা পূ্র্ব বাংলার স্বাধীনতা সংগ্রামে কিছুটা ভুমিকা পালন করতে পারে এবং জমিদার বিরোধী ভূমি বিপ্লবী সংগ্রামে নিরপেক্ষ থাকতে পারে। এ কারণে আমরা ধনী চাষীদের জমিদার শ্রেনীভুক্ত করবো না এবং অপরিপক্কভাবে তাদের ধ্বংস করার নীতি নেব না।’(সূত্রঃ সিরাজ সিকদার রচনা সংগ্রহ, শ্রাবন প্রকাশনী; প্রকাশঃ ফেব্রুয়ারি, ২০০৯; পৃঃ ৫০।
মাও্ সেতুঙ তার ‘চীনা সমাজের শ্রেনী বিশ্লেষণ’ প্রবন্ধে জমিদার শ্রেনী ও মুৎসুদ্দী শ্রেনী ব্যতীত মাঝারী বুর্জোয়া শ্রেনী থেকে শুরু করে পাতি বুর্জোয়া, স্বত্ত্বাধিকারী কৃষক, মালিক-হস্তশিল্পী, ছাত্র-প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্কুলের শিক্ষক, অফিসের কেরানী, ছোট ব্যবসায়ী, দোকান কর্মচারী, ফেরী ‍ওয়ালা, আধা সর্বহারা, সর্বহারা শ্রেনী প্রমুখকে বিপ্লবে সম্পৃক্ত করার কথা বলেছিলেন। ছোট প্রবন্ধটির শেষে তিনি বলছেন-
‘সংক্ষেপে, এটা সুস্পষ্ট যে সাম্রাজ্যবাদের সঙ্গে যোগসাজশে লিপ্ত সমস্ত সমরনায়ক, আমলা মুৎসুদ্দি পুঁজিপতি শ্রেনী, বড় জমিদার শ্রেনী এবং তাদের সঙ্গে সংযুক্ত বুদ্ধিজীবীদের প্রতিক্রিয়াশীল অংশ হলো আমাদের শত্রু। শিল্পকারখানায় কর্মরত সর্বহারা শ্রেনীই হলো আমাদের বিপ্লবের নেতৃত্বস্থানীয় শক্তি। সমস্ত আধা সর্বহারা এবং পাতি বুর্জোয়া হলো আমাদের নিকটতম বন্ধু। দোদুল্যমান মাঝারী বুর্জোয়া শ্রেনীর দক্ষিণপন্থীরা আমাদের শত্রু হতে পারে এবং বামপন্থীরা আমাদের মিত্র হতে পারে- কিন্তু আমাদের সর্বদাই সতর্ক থাকতে হবে এবং তাদেরকে আমাদের ফ্রন্টের মধ্যে বিভ্রান্তি সৃষ্টি করতে দেয়া চলবে না।
(পৃঃ ৯)
সুতরাং, শ্রেনী দৃষ্টিভঙ্গির দিক থেকে এই ‘ধনীক শ্রেনী’ বা গ্রাম্য ভাষায় ‘জমিদার শ্রেনী’র প্রতি বিপ্লবী পার্টির দৃষ্টিভঙ্গি কী হওয়া উচিত বা তাদের বিষয়ে কী কর্মসূচি প্রদান করা করণীয় তা নিশ্চয়ই স্পষ্ট হয়ে থাকবে। তাই নতুনভাবে আর ব্যাখ্যা প্রদান করার দরকার নেই বলে বিশ্বাস।
নিকটাত্মীয় স্থানীয় ব্যক্তির পরিবারের অভিজ্ঞতা বর্ণনা করে এত উদ্ধৃতি দেয়ার কারণ হলো পার্বত্য চট্টগ্রামে সর্বহারা পার্টির ভুমিকা বা তার রাজনৈতিক সাংগঠনিক কার্যকৌশল তথা বাস্তব কর্মসূচি বিষয়ে আলোকপাত করা এবং তা যে শ্রেনী আন্দোলন তথা কমিউনিস্ট আন্দোলনের দিক থেকে নানা দিক থেকে ভুল পথে পরিচালিত হয়েছে সেদিকে দৃষ্টি দেবার চেষ্টা করা। এখানে সিরাজ সিকদার বা তার পরিচালিত সর্বহারা পার্টিকে ‘তুলোধুনো’ করার জন্য এই কাজটি করা হচ্ছে না। এটা বলা প্রয়োজন যে, বিল্পবকে এগিয়ে নিতে হলে বিল্পবী পার্টিকেই ‘মূল্যায়নের’ মধ্যে আনতে হবে। সেদিক থেকে বিবেচনা করেই এই লেখা। সর্হারা পার্টি বা অন্য কোনো পার্টি যদি আদৌ বিপ্লবী পার্টি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হতে চায়, তবে সেই পার্টিকে এই ‘স্ক্রীনিং’এর ভেতর দিয়েই যেতে হবে। অর্থাৎ পার্টিকে অবশ্যই তার অতীত থেকে বা অতীতের ভুলভ্রান্তি থেকে বাস্তবভাবেই শিক্ষা নিতে হবে।
জাতি বা জাতিসমূহের অধিকার বিষয়ে গঠনতান্ত্রিকভাবে বা দলিলে সর্বহারা পার্টির অবস্থান
সর্বহারা পার্টির নিউক্লিয়াস সংগঠন পূর্ব বাংলা শ্রমিক আন্দোলন ১৯৬৮ সালের জানুয়ারি মাসে প্রকাশিত তাদের থিসিসে ‘জাতীয় জনগণতান্ত্রিক বিপ্লবের সাধারণ কর্মনীতি’ অংশে জাতি বা জাতিসত্তাসমূহের বিচ্ছিন্ন হবার অধিকারসহ স্বায়ত্তশাসন ও সাংস্কৃতিক ও ভাষাগত বিকাশের পূর্ণ সুযোগ দেয়ার কথা বলেছে।
এই কর্মনীতি’র ৯ ও ১০ নম্বর অংশে বলা হয়েছে-
‘৯. বিচ্ছিন্ন হবার অধিকারসহ বিভিন্ন সংখ্যালঘু জাতিকে স্বায়্ত্তশাসন ও বিভিন্ন উপজাতিকে আঞ্চলিক স্বায়ত্তশাসন দেয়া হবে।’
’১০. সকল অবাঙালী দেশপ্রেমিক জনগণের সাংস্কৃতিক ও ভাষাগত বিকাশের পূর্ণ সুযোগ দেয়া হবে।’
(সিরাজ সিকদার রচনা সংগ্রহ; পৃঃ ২৪)
কিন্তু পরে উক্ত সংগঠন পার্টি হিসেবে সর্বহারা পার্টি নাম ধারণ করে তার কাজ পরিচালনার সময় ১৯৭১ সালের সেপ্টেম্বর মাসে যে খসড়া সংবিধান প্রণয়ন করে তাতে সুস্পষ্টভাবে ‘জাতি বা জাতিসত্তাসমূহের জনগণের’ অধিকারের পক্ষে কোনো বাক্য বা বাক্যাংশ সংযুক্ত করা হয়নি।শুধুমাত্র প্রথম অধ্যায়ের সাধারণ কর্মসূচি’র ৪ নম্বর অংশে ‘নিপীড়িত জনগণ ও নিপীড়িত জাতির সঙ্গে ঐক্যবদ্ধ হয়ে’ ‘সমগ্র মানবজাতির মুক্তির জন্য সম্মিলিতভাবে সংগ্রাম’ চালানোর কথা বলা হয়েছে। (সিরাজ সিকদার রচনা সংগ্রহ; পৃঃ ১৩২)
এই খুবই নগন্য বা অস্পষ্ট তাত্ত্বিক সাংগঠিক বা কর্মর্সূচিগত অবস্থান পরে কী ধরণের ভ্রান্তিতে একটি দলকে নিপতিত করতে পারে আমরা পরে তা দেখবো। এবং এই ভ্রান্তির কারণে পার্বত্য চট্টগ্রামে অধিকারের লক্ষ্যে আন্দোলনরত সংগঠনের সাথে সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়া ও পার্বত্য চট্টগ্রাম থেকে সর্বহারা পার্টির নিশ্চিহ্ন হয়ে যেতে দেখবো।
এই শ্রেনী বিশ্লেষণ বাদেও পার্বত্য চট্টগ্রামের জাতিগত বা জাতিসত্তাগত স্বাতন্ত্র্যের দিকটি বিবেচনায় নিলে সিরাজ সিকদারের সর্বহারা পার্টির জাতি বা জাতিসত্তাসমূহের জনগণের স্বাতন্ত্রের বা স্বাধিকার তথা স্বায়ত্তশাসনের অধিকারের বিষয়টি নিয়ে আমরা আরো বেশি কিছু বলতে পারি।
তবে প্রসঙ্গটির বিষয়বস্তু ব্যাপক বিস্তৃতি হবে বিধায় আমরা সেদিকে আলোকপাত করছি না।
পার্বত্য চট্টগ্রামের আন্দোলনকামী সংগঠন বিষয়ে সর্বহারা পার্টি
এ বিষয়ে শুধুমাত্র একটি দলিল আমরা পাই। দলিলের শিরোনামা- ‘পার্বত্য চট্টগ্রামের সংকীর্ণ জাতীয়তাবাদীদের প্রতিক্রিয়াশীল কার্যকলাপ’। ১৯৭৪ সালের সেপ্টেম্বর মাসে স্ফুলিঙ্গ নামক প্রকাশনায় লেখাটি প্রকাশিত হয়। এতে জনসংহতি সমিতি বা জেএসএস’র আন্দোলনকে ‘চাকমাদের আন্দোলন’ বলে অবস্থান তুলে ধরা হয়। লেখাটির প্রথমেই বলা হয়েছে-
সামন্ত ক্ষুদে বুর্জোয়াদের নেতৃত্বে চট্টগ্রামের চাকমা জাতিসত্তার মধ্যে একটি সংকীর্ণ জাতীয়তাবাদী আন্দোলন চলে আসছে। তারা শোষক ও শোষিত বাঙালীদের মধ্যে কোন পার্থক্য রেখা টানে না, সকল বাঙালীকেই শত্রু মনে করে।(সিরাজ সিকদার রচনা সংগ্রহ; পৃঃ ৬০৩)
এছাড়া এই সংকীর্ণ জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের নেতৃত্বদানকারী চাকমা জাতিগোষ্ঠী অন্যান্য জাতিসত্তার প্রতি নির্যাতনমূলক পদক্ষেপ গ্রহণ করে বলে বক্তব্য দেয়া হয়। লেখা হয়েছে-
‘তারা পার্বত্য চট্টগ্রামের বিভিন্ন জাতিসত্তার জন্য স্বায়ত্তশাসনের প্রতিশ্রুতি না দিয়ে পার্বত্য চট্টগ্রামের স্বায়ত্তশাসন, কখনো কখনো বিচ্ছিন্নতা দাবি করে।
এ দাবির অর্থ হচ্ছে কিছুটা ক্ষুদে বুর্জোয়া আলোকপ্রাপ্ত সংখ্যাধিক চাকমা জাতিসত্তার ক্ষমতা দখল এবং অন্যান্য জাতিসত্তার উপর তাদের কর্তৃত্ব ও নিপীড়ন।’(সূত্রঃ সিরাজ সিকদার রচনা সংগ্রহ; পৃঃ ৬০৩)
উক্ত দলিলে দেখা যায় কমিউনিস্ট পার্টি জাতি সম্পর্কিত দৃষ্টিভঙ্গির অন্যতম উপাদান বা যা সর্বহারার পার্টির নিউক্লিয়াস পূর্ব বাংলার শ্রমিক আন্দোলন ঘোষনা দিয়েছে, সেই ‘বিচ্ছিন্ন হবার অধিকারসহ বিভিন্ন সংখ্যালঘু জাতিকে স্বায়ত্তশাসন’ প্রদানের কথা উল্লেখ নেই। তার বিপরীতে লেখা রয়েছে-
‘পূর্ব বাংলার সর্বহারা পার্টি নিপীড়িত বাঙালী-পাহাড়ীদের ঐক্যের পক্ষপাতি এবং পাহাড়ী-বাঙালীদের সমঅধিকার, পাহাড়ী জাতিসত্তাসমূহের প্রত্যেকের জন্য স্বায়ত্তশাসনের পক্ষপাতী।’(সূত্রঃ সিরাজ সিকদার রচনা সংগ্রহ)
উক্ত দলিলে বলা হয়, পার্বত্য চট্টগ্রামে শান্তিবাহিনী বা জনসংহতি সমিতি দুর্বল হচ্ছে বা জনভিত্তি হারাচ্ছে এবং সর্বহারা পার্টি শক্তিশালী হচ্ছে।
সর্বহারা পার্টি বিষয়ে জেএসএস বা শান্তিবাহিনীর দৃষ্টিভঙ্গি
পার্বত্য চট্টগ্রামে সশস্ত সংগ্রামের কাল ১৯৭৬ থেকে ১৯৯৭ সাল পর্যন্ত বলা যায়। এই সময়ের প্রথমদিকে উক্ত অঞ্চলে সর্বহারা পার্টিও সক্রিয় ছিল। তাদের মধ্যে সংঘাত সংঘর্ষ হয়েছে। এবং এ বিষয়ে উপরে উল্লিখিত দলিলে বক্তব্যও দেয়া হয়েছে। এসব বিষয়ে বিস্তারিত না গিয়ে শান্তিবাহিনী বা জেএসএস সর্বহারা পার্টি বিষয়ে কী মত পোষণ করতো তা নিয়ে কিছু উল্লেখ করা প্রয়োজন। তবে এক্ষেত্রে জেএসএস আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো দলিল আকারে লেখা প্রকাশ করেনি। অন্তত এ পর্যন্ত সেরকম দলিল আমরা পাইনি। তবে বিভিন্ন প্রকাশনায় বা বইয়ে ব্যক্তিগতভাবে শান্তিবাহিনী বা জেএসএস সদস্যদের বক্তব্য আমরা পাই
সর্বহারা পার্টি বিষয়ে তাতিন্দ্রলাল চাকমা প্রকাশ মেজর পেলে জানাচ্ছেন-
“১৯৭৪ সালের এপ্রিল অথবা মে মাসের ঘটনা। স্থানটির নাম নাহক্য, গবমারা। এটা রাঙামাটি জেলার রাজস্থলী থানার একটি গ্রাম। আমার গেরিলা জীবনের প্রথম অপারেশন। ….। খবর পেলাম পূর্ববাংলা সর্বহারা পার্টি নিয়ন্ত্রিতি একটি সশস্ত্র গেরিলা গ্রুপের অবস্থান। জানতে পারলাম পূর্ববাংলা সর্বহারা পার্টির এই গ্রুপে সাতজন গেরিলা আছে এবং তারা সবাই অস্ত্রধারী।হালকা ভারী সব অস্ত্রই আছে তাদের কাছে।…।সর্বহারা পার্টির জোন কমান্ডার লগ্ন কুমার তঞ্চঙ্গ্যা রয়েছেন নেতৃত্বে।
এরা নানাভাবে আমাদের সংগ্রামে বাধা সৃষ্টি করছিল। স্বাধীনতার পর থেকেই এদেরকে মোকাবেলা করতে হচ্ছিল আমাদের। (বোল্ড করা হল)সিদ্ধান্ত হল সর্বহারার এই গ্রুপটির গোপন আস্তানায় গিয়ে আকস্মিকভাবে আক্রমণ করবো।”(সূত্রঃ শান্তিবাহিনীঃ গেরিলা জীবন, গোলাম মোর্তোজা, সময় প্রকাশন, পৃঃ৬৩)
এছাড়া আরেকজন গুরুত্বপূর্ণ জেএসএস সদস্য স্নেহ কুমার চাকমা সর্বহারা পার্টি বিষয়ে না হলেও পূর্ব বাংলার কমিউনিস্ট পার্টির একজন সদস্যের সাথে দেখা হবার পরে পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ে উক্ত ব্যক্তির মতামত জেনে এ বিষয়ে যে মন্তব্য করেন তা এখানে বলা দরকার। তিনি লিখছেন-
পার্টি জীবনে যে কয়েকজন বাঙালী মুসলমান বামপন্থী রাজনৈতিক কর্মীর সহিত আমার ঘটনাক্রমে দেখা হয়েছিল তারা সকলেই পার্বত্য চট্টগ্রামে ভুমি বেদখলকারী বাঙ্গালী মুসলমানদেরকে পার্বত্য চট্টগ্রামে রাখার পক্ষে মত প্রকাশ করতেন। তাই মনে করি মুসলমান বাঙ্গালী কম্যুনিস্টরা তাদের জাতীয় স্বার্থে সম্প্রসারণ নীতিকে লালন করে কম্যুনিস্ট রাজনীতির চর্চা করেন। তাই করেন বলে পার্বত্য চট্টগ্রামের প্রান্তিক পর্যায়ে পড়া জুম্মদের অস্তিত্ব রক্ষার কথা চিন্তা করেন না, বলেন না।’(সূত্রঃ জীবনালেখ্য, জীবন, সংগ্রাম ও সংঘাতময় দিনগুলির কথা, স্নেহ কুমার চাকমা, আগস্ট, ২০১১; পৃঃ ১৮৫)
এখানে আমি মাত্র এই দুইজনের উদ্ধৃতি যোগ করলাম। পরে আরো কোনো জেএসএস সদস্য বা জেএসএস’র সাংগঠনিক বক্তব্য প্রকাশিত হলে নিশ্চয়ই তা যোগ করার আশা থাকলো। তবে এই দুই বক্তব্যের মাধ্যমে পার্বত্য চট্টগ্রামে সশস্ত্র সংগ্রাম চলাকালীন সর্বহারা পার্টি বা দেশের অন্য কমিউনিস্ট পার্টি বিষয়ে জেএসএস বা জেএসএস সদস্যদের মনোভাব প্রকাশ হয়েছে বলে মনে করা যায়।
এতে দেখা যায়, পার্বত্য চট্টগ্রামের সচেতন রাজনৈতিক অংশ বা যারা তৎকালীন সময়ে জনসংহতি সমিতি বা শান্তিবাহিনী গঠন করে লড়াই করে যাচ্ছিল তারা দেশের বৃহত্তর জাতি বা জাতিসত্তার প্রতিনিধিত্বকারী পার্টিকে বিশ্বাস স্থাপন করতে পারেনি বা বিশ্বাস করেনি।
এখানে বলা দরকার পূর্ব বাংলার শ্রমিক আন্দোলনের থিসিসের সাধারণ কর্মনীতি অংশের দশ নম্বর ধারায় লেখা হয়েছে- ‘সকল অবাঙালী(গুরুত্বপ্রদানের জন্য বোল্ড করা হল)দেশপ্রেমিক জনগণের সাংস্কৃতিক ও ভাষাগত বিকাশের পূর্ণ সুযোগ দেয়া হবে।’ এই ‘অবাঙালী’ শব্দবন্ধ ব্যবহারের মাধ্যমেই বোঝা যায়, সর্বহারা পার্টি আন্তর্জাতিকতাবাদী দৃষ্টিভঙ্গি ধারণ করার কথা বললেও আদতে ‘বাঙালী জাতীয়তাবাদ’ থেকে এই দলটি উপরে উঠতে পারেনি।
কমিউনিস্ট আন্দোলনে জাতি বা জাতিসত্তার অধিকারের প্রশ্ন
এই বিষয়বস্তু নিয়ে মার্ক্স, লেনিন, স্তালিন, মাও সেতুং থেকে শুরু করে কমিউনিস্ট বিপ্লবীদের অনেকেই লিখেছেন।সুতরাং আমি এ বিষয়ে বিস্তারিত যাচ্ছি না।
বাংলাদেশের পাশের দেশ বার্মা বা মায়ানমার বা মিয়ানমার। এই দেশটির কমিউনিস্ট আন্দোলন বিষয়ে আমাদের সচেতন মহলে তেমন ধারনা নেই। এছাড়া এই আন্দোলন বিষয়ে এমনকি বার্মা বিষয়েও আমাদের দেশে তেমন বইপত্র পাওয়া যায় না। কিন্তু বার্মা কমিউনিস্ট পার্টি বিষয়ে সম্ভবত আমাদের দেশের কমিউনিস্ট নামে পরিচিত বিপ্লবী পার্টি-সংগঠন ও ব্যক্তির ধারনা থাকা দরকার বলে মনেকরি।
একসময় বার্মায় কমিউনিস্ট পার্টি অব বার্মা বা বিসিপি/সিপিবি খুব শক্তিশালী সংগঠন ছিল। এই সংগঠন সশস্ত্র সংগ্রামও করেছে। কিন্তু ১৮৮৯ সালের দিকে এই সংগঠন দুর্বল হয়ে যায় এবং একঅর্থে তাদের অস্তিত্ব নিভু নিভু হয়ে যায়, যদিও এখনো তা নেভেনি।
এই পার্টি একসময় সারা বার্মায় ছড়িয়ে ছিল। পরে তারা বার্মার শান রাজ্যের দিকে পশ্চাদ্ভাবন করে। সেখানে তারা চীনা কমিউনিস্ট পার্টির সহায়তায় বার্মার মধ্যে চীন বা হান জাতিসত্তার জনগণের মাঝে তাদের সংগঠনের ভিত সুদৃঢ় করে। কিন্তু ১৮৮৯ সালের দিকে হান জাতি বা সেখানে কোকাং নামে পরিচিত জনগণের কমিউনিস্ট যুবনেতৃত্ব পুরাতন বা বয়স্ক এবং বার্মা জাতিভুক্ত নেতৃত্বকে তাদের অঞ্চল থেকে হটিয়ে দেয়। বার্মা কমিউনিস্ট পার্টির নেতৃবৃন্দ চীনে পালিয়ে যান। এই ধরনের অভ্যন্তরীণ ক্যুদেতা বা ক্ষমতা দখল কেন হলো। এ বিষয়ে তেমন জানা না না গেলেও এটা বলা যায় যে, মূলত জাতি বা জাতিসত্তার আন্দোলন বিষয়ে ভুল দৃষ্টিভঙ্গি গ্রহনের জন্যই একসময়ের শক্তিশালী এই সংগঠন দুর্বল হয়ে যায়। Bertil Lintner নামে সুইডিশ লেখক The Rise and Fall of The Communist Party of Burma নামে একটি বই লেখেন। ১৯৮৬ সালের অক্টোবর থেকে ১৯৮৭ সালের এপ্রিল পর্যন্ত তিনি বার্মা কমিউনিস্ট পার্টি নিয়ন্ত্রিত অঞ্চলে অবস্থান করে নেতৃবৃন্দের সাক্ষাতকার নিয়ে উক্ত বইটি প্রকাশ করেন। উক্ত বই নিয়ে বার্মা সংশ্লিষ্ট একটি ওয়েবসাইটে যে রিভিউ করা হয় তাতে লেখক বইয়ে যে মূল্যায়ন করেন তার দুই লাইনে তুলে ধরেন। তাতে লেখা রয়েছে-
তিনি লিখেছেন, ‘উত্তরপূর্ব অঞ্চলের ঘাঁটি এলাকার জনগণের কাছে কমিউনিস্ট মতাদর্শ ফাঁপা বুলি বা ধারণা হয়ে গেল জনগণের কাছে কোনো অর্থ বহন না করায় বা বস্তুগত কিছু বোধগম্য প্রমাণিত না হওয়ায়।’(Communist ideology became a hollow concept without any real meaning to the people in the northeastern base areas,” he writes.)।
‘বার্মা কমিউনিস্ট পার্টির জন্য এটি একটি তাৎপর্যপূর্ণ শিক্ষা যে,দলটি বিদ্রোহের মুখে পড়েছিল কারণ তারা মতাদর্শকে উপরে স্থান দিয়েছিল এলাকার জাতিসত্তাসমূহের অধিকার প্রদানের চেয়ে।’(“It would be an important history lesson for the CPB that it faced mutiny because they had prioritized their ideology rather than ethnic rights (in the region).”)
লেখকের বক্তব্যকে হুবহু আমলে না নিয়েও এটা বলা যায়, তত্ত্ব ও প্রয়োগের মধ্যে সংযোগ সাধন করতে না পারায় এবং জাতিসত্তার জনগণকে কমিউনিস্ট মতাদর্শে উদ্বুদ্ধ করতে না পারায় এতবড় একটি পার্টি পরে তার সকল শক্তি হারিয়ে ফেলে।
এই একই কথা পূর্ব বাংলার সর্বহারা পার্টির ক্ষেত্রেও যে অসত্য তা বলা যাবে না।
এখানে প্রসঙ্গক্রমে চীনে মাও সেতুঙের নেতৃত্বাধীন কমিউনিস্ট পার্টি ঐতিহাসিক লংমার্চের সময় বিভিন্ন জাতি বা জাতিসত্তার জনগণ অধ্যুষিত জনগণের বিরাট বিরাট এলাকা অতিক্রম করার সময় সে সকল স্থানে অবস্থানকারী জাতি বা জাতিসত্তার জনগণের ব্যাপক প্রতিরোধ ও হামলার মুখোমুখি হয়েছিল। কিন্তু চীনা কমিউনিস্ট পার্টি সে অঞ্চেলের জাতি বা জাতিসত্তার বিরুদ্ধে কোনো বিরুদ্ধ পদক্ষেপ না নিয়ে ধৈর্য ধরে পরিস্থিতির মোকাবেলা করেছিল এবং পরে চীনের এই সকল জাতি বা জাতিসত্তার জনগণ চীনা কমিউনিস্ট পার্টিকে সর্বতোভাবে সহায়তা করেছিল এমনকি হয়তো গুরুত্বপূর্ণ ভুমিকাও তারা পালন করতে সক্ষম হয়েছিল।
কিন্তু বাংলাদেশে পূর্ব বাংলার সর্বহারা পার্টি থেকে শুরু করে কমিউনিস্ট নামে পরিচিত বিভিন্ন সংগঠন পার্টি জাতি বা জাতিসত্তার অধিকার নিয়ে যেমন সঠিক অবস্থান নেয়নি তেমনি বৃহত্তর প্রেক্ষিতে নিশ্চয়িই আরো অনেক গুরুতর ভ্রান্তির মধ্যে পড়েছিল বলে আজ দেশে কমিউনিস্ট আন্দোলন যে মাত্রা ও গুরুত্ব নিয়ে জনগণের কাছে হাজির হবার কথা তার অনুপস্থিতি আমরা লক্ষ্য করি। এ বিষয়ে গভীর অনুসন্ধান ও বিশ্লেষণ আরো হওয়া প্রয়োজন।
কৈফিয়ত: এখানে যে বক্তব্য উপস্থাপন করা হয়েছে তা নিয়ে আরো অন্য দৃষ্টিভঙ্গি বা ভিন্ন বক্তব্য থাকতে পারে।এ বিষয়ে আলোচনা হলে খুশি হব।