Wednesday, April 8, 2015

আসামের গেরিলা সংগঠন উলফার প্রতিষ্ঠা দিবস ০৭ এপ্রিল

৭ এপ্রিল, ২০১৫। ১৯৭৯ সালের এই দিনে আসামের শিবসাগরের রঙঘর নামে এক এলাকায় আসামের স্বাধীনতাপন্থী কয়েকজন যুবনেতা ইউনাইটেড লিবারেশন ফ্রন্ট অব আসাম বা উলফা গঠন করেন। ভীমকান্ত বোরগোহাইন, পরেশ বড়ুয়া/বোড়া, রাজীব রাজকোনওয়ার প্রকাশ অরবিন্দ রাজখোয়া. অনুপ চেটিয়া প্রকাশ গোলাপ বড়ুয়া/বোড়া, প্রদীপ গোগোই, প্রকাশ সমীরণ গোগোই, ভদ্রেশ্বর গোহাইন , মিথিঙ্গা দাইমারী, চিত্রবন হাজারিকা, শশধর চৌধুরী প্রমুখ এই সংগঠনের নেতৃত্ব পর্যায়ে রয়েছেন। 
আসামের স্বাধীনতার ডাক দিয়ে এই সংগঠেনর জন্ম হয়েছিল। ভারত থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে একটি স্বাধীন সার্বভৌম সমাজতান্ত্রিক আসাম গঠন ছিল তাদের মূলমন্ত্র।
উলফা তাদের সংগঠনের লক্ষ্য উদ্দেশ্য সম্পর্কে বলার প্রারম্ভে ঘোষনা করেছে-
পৃথিবীর বিভিন্ন জাতি তাদের নিজস্ব স্বতন্ত্র পরিচয় ও সমূহ উন্নতির জন্য লড়াই করে যাচ্ছে। সাচ্চা কথা্ এই যে, সংগ্রামের ইতিহাস মানে হলো অন্যায়ের বিপরীতে ন্যায় এবং মিথ্যার বিপরীতে সত্যকে প্রতিষ্ঠার সংগ্রাম। এছাড়াও একটি জাতি যখন বিজাতীয় শাসনের অধীনে থাকে তখন তার স্বাধীনতা ও জাতীয় মুক্তির লড়াই ব্যতীত অন্য কোনো পথ খোলা থাকে না।
১৯৮৪ সালে উলফা তাদের কার্যক্রম জোরদার করতে তৎপরতা চালায়। তারা প্রথমে ব্যাপকভাবে অর্থ সংগ্রহের উদ্যোগ নেয়। তারা নিজস্ব সশস্ত্র গ্রুপ গঠন করে । সংগঠনের কর্মীদের সামরিক প্রশিক্ষণ প্রদানের জন্য ভারতের নাগাল্যান্ডের ন্যাশনাল সোশ্যালিস্ট কাউন্সিল অব নাগাল্যান্ড বা এনএসসিএন এবং মায়ানমার বা বার্মার গেরিলা সংগঠন  কাচিন ইন্ডিপেন্ডেন্টস আর্মি বা কে আই এ’র সহায়তা গ্রহণ করে বলে জানা যায়। উলফার প্রভাব আসামে বৃদ্ধি পাওয়ায় ভারত সরকার ১৯৮৬ সালের ৭ নভেম্বর এই সংগঠনকে বেআইনী ঘোষনা করে।
এখানে বলা প্রয়োজন আসাম হলো ভারতের উত্তরপূর্বাঞ্চলের সাতটি রাজ্যের মধ্যে অন্যতম এবং বড় একটি রাজ্য।
ভারত উলফার কার্যক্রমকে দমন করার জন্য সেখানে সামরিক বাহিনী মোতায়েন করে। ১৯৯০ সালের নভেম্বর মাসে অপারেশন বজরঙ, ১৯৯১ সালের সেপ্টেম্বরে অপারেশন রাইনো, ২০০৩ সালের ডিসেম্বর মাসে অপারেশন অল ক্লিয়ার এবং পরবর্তিতে অপারেশন রা্‌ইনো দুই নামে বেশ কয়েকটি অভিযান পরিচালনা করে উলফাকে দমনের চেষ্টা চালায় ভারত।
এতে উলফার অনেক সদস্য আত্মসমর্পন করতে বাধ্য হয়। ১৯৯২ সালে উলফার উচ্চস্তরের কয়েকজন নেতা তাদের অনুসারীদের নিয়ে ভারত সরকারের কাছ থেকে আত্মসমর্পন করে।
উলফা এই সময় নিজেদের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে পাশের দেশ বাংলাদেশ ও চীনে আশ্রয় নিয়ে তাদের কার্যক্রম চালায় বলে জানা যায়। এবং এক পর্যায়ে তারা পাকিস্তানের গোয়েন্দা সংস্থা আইএসআই এবং বাংলাদেশের ডিজিএফআই-এর সাথে তারা সম্পর্ক রেখে কাজ করতো বলে ভারত সরকার বিভিন্ন সময় অভিযোগ করে।
উলফার কিছু অংশ ভুটানেও আশ্রয় গ্রহণ করে। তবে ২০০৩ সালে ভুটান সরকার উলফাসহ বেশ কয়েকটি গেরিলা সংগঠনকে তাদের দেশ থেকে বের করে দিতে ব্যাপক অভিযান পরিচালনা করে এবং উলফাকে সেখান থেকে সরে যেতে হয়।
২০০৪ সালের দিকে উলফা ভারত সরকারের সাথে আলোচনায় বসার জন্য ইচ্ছা প্রকাশ করে। এরই মধ্যে বেশ কয়েকবার পিপলস কনসালটেটিভ গ্রুপ নামক মধ্যস্থতাকারী একটি দলের মাধ্যমে ভারত সরকার উলফার সাথে আলোচনায় বসে। ২০০৬ সালের দিকে আবার সংঘাত শুরু হয়।  দুই পক্ষই আলোচনা থেকে সরে যায়।
২০০৯ সালের দিকে উলফার প্রধান অরবিন্দ রাজখোয়া বাংলাদেশে গ্রেপ্তার হন। এরপর তাকে ভারতে ফেরত নেয়া হয়। সেখানে আবার নতুন করে ভারত সরকার উলফার সাথে আলোচনা শুরু করে। কিন্তু উলফার অন্যতম নেতা পরেশ বড়ুয়া ভারত সরকারের সাথে তাদের বন্দী নেতাদের মধ্যেকার আলোচনাকে মেনে নেননি। তিনি এখনো লড়াই চালিয়ে যাচ্ছেন বলে জানা যায়। ভারতের বিভিন্ন গণমাধ্যমসূত্রে জানা যায়, তিনি আসামের প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে কর্মী সংগ্রহ করে উলফার সামরিক শাখা শক্তিশালী করার চেষ্টা  চালিয়ে যাচ্ছেন।
তবে এরই মাঝে আসামের এই লড়াইয়ে প্রাণ কেড়ে নিয়েছে প্রায় ৩০ হাজার জনের। এখন সংঘাত তেমন না থাকলেও পরেশ বড়ুয়ার নেতৃত্বাধীন উলফার কার্যক্রম চলতে থাকায় এবং আসামের জনগণের মাঝে সংগঠনের কার্যক্রম জারি থাকায় ভবিষ্যতে আসামের লড়াইয়ের পরিণতি কী হবে তা একমাত্র ভবিষ্যতই বলে দেবে এই মাত্র ধারণায় নেয়া যেতে পারে।
তথ্যসূত্র:

Tuesday, April 7, 2015

কোথা থেকে শুরু করতে হবে?

রাশিয়ার অক্টোবর বিপ্লবের সার্থক রূপকার ভ্লাডিমির  ইলিচ উইলিয়ানভ লেনিন ইস্ক্রা বা স্ফুলিঙ্গ নামক পত্রিকার ১৯০১ সালের মে মাসে প্রকাশিত ৪র্থ সংখ্যায় লিখেছিলেন ছোটো একটি লেখা। শিরোনাম, ‘Where to Begin?’।
সেই লেখার প্রথমে তিনি লিখছেন, সাম্প্রতিক সময়ে বিশেষ জোর দিয়ে রাশিয়ান সোশ্যাল ডেমোক্র্যাটরা ‘কী করতে হবে’ এই বিষয় নিয়ে আলোচনা করছে। আমরা কী পথ গ্রহণ করবো ( যা নিয়ে গত ৮০ ও ৯০ দশকে আলোচনা হয়েছিল)তা নিয়ে এই আলোচনা নয়। বরং আমাদের পরিচিত পথ বা আদর্শের মধ্য থেকে আমরা কী বাস্তব পন্থা গ্রহণ করবো বা কীভাবে তা আত্মস্থ বা বাস্তবে রূপায়ণ করবো তা নিয়েই এই আলোচনা চলছে। রাজনৈতিক কাজের পদ্ধতি বা পরিকল্পনা নিয়ে এই আলোচনা।
এরপর তার লেখায় পার্টিতে চলমান বিভিন্ন চিন্তাধারা বা মতভেদ বিষয়ে তিনি কথা বলেন।
তিনি বলেন, লাইবনেখট-এর  উদ্ধৃতি ব্যবহার করা হচ্ছে- ‘যদি ২৪ ঘন্টার মধ্যে প্রেক্ষাপট বা পরিস্থিতির বদল হয় তবে ২৪ ঘন্টার মধ্যেই রণকৌশলও বদলে নিতে হবে।‘ (If the circumstances change within twenty-four hours, then tactics must be changed within twenty-four hours.”)
লেনিন পার্টিতে যারা উক্ত চিন্তা লালন করেন তাদের বিষয়ে বা তাদের দৃষ্টিভঙ্গি বিষয়ে তার উক্ত লেখায় তী্ব্র সমালোচনা করে লেখেন-
কোনো বিশেষ পরিস্থিতিতে আন্দোলনের কৌশল বা পার্টি সংগঠনের বিশেষ কিছু বিষয়ে ২৪ ঘন্টার মধ্যে কৌশল বদলানো সম্ভব । কিন্তু সাধারণভাবে, ধারাবাহিকভাবে এবং আবশ্যিকভাবেই সংগ্রামী ধারার সংগঠনের প্রয়োজনীয়তা বা জনগণের মধ্যে রাজনৈতিক লড়াই জারি রাখার প্রয়োজনয়তা আছে  কী না তা নিয়ে ২৪ ঘন্টা বা ২৪ মাসের মধ্যে নিজের দৃষ্টিভঙ্গি পাল্টাতে পারে একমাত্র সার্বিকভাবে নীতি বিবর্জিত ব্যক্তিগণই।
অর্থাৎ, সংগঠন ও সংগ্রাম ও জনগণকে সংগঠিত করার জন্য রাজনৈতিক কর্মসূচি বা রাজনৈতিক লড়াইয়ের প্রয়োজনীয়তার উপর তিনি গুরুত্বারোপ করেছেন।

তিনি আরো বলছেন,
পরিবর্তিত পরিস্থিতি বা সময়ের প্রেক্ষাপট পরিবর্তনকে যুক্তি হিসেবে তুলে ধরা নিতান্তই হাস্যকর। যে কোনো সময় তথা ‘একঘেয়ে শান্তিপূর্ণ’ সময়ে বা যেভাবেই বলি না কেন‘বিপ্লবী চেতনার ক্ষয়মানতার’ সময়েও সংগ্রামী ধারার সংগঠন গড়ে তোলা এবং রাজনৈতিক সংগ্রাম জারি রাখা আবশ্যিক অপরিহার্যভাবেই প্রয়োজনীয়। বিস্ফোরন্মুখ বা ঝাঁকুনির সময়ে সংগঠন দৃঢ় করতে গেলে দেরী হয়ে যাবে। মুহূর্তের মধ্যেই সক্রিয় ভূমিকা গ্রহণ করার মতো প্রস্তুতি বা সক্রিয়তা পার্টির মধ্যে থাকতে হবে।
এরপর তিনি ‘২৪ ঘন্টার মধ্যে কৌশল বা রণকৌশল বদলের’ দৃষ্টিভঙ্গিকে ভ্রান্ত প্রমাণের জন্য আলোচনা টেনে নেন।
তিনি বলেন, কিন্তু এই ‘রণকৌশল’ তথা ‘কৌশল’ বদলানোর জন্য আবশ্যিকভাবেই প্রয়োজন একটি ‘রণকৌশল’। এবং যেকোনো পরিস্থিতিতে বা যে কোনো সময়ে রাজনৈতিক সংগ্রাম সংঘটন করার মতো একটি করিৎকর্মা শক্তিশালী সংগঠন না থাকলে ধারাবাহিক কার্য পরিকল্পনা, দৃঢ়বদ্ধভাবে নীতিতে সম্মোহিত অবিচলতা, দ্রুততম উপায়ে কার্য সাধন ইত্যাদির প্রসঙ্গ বা প্রশ্ন আসে না বা থাকে না।
তিনি বারে বারে জনভিত্তির উপর প্রতিষ্ঠিত সংগঠন ও সংগ্রামের উপরই গুরুত্ব আরোপ করতে চেয়েছেন।
পরবর্তি আলোচনায় তিনি সন্ত্রাসবাদী কর্মপন্থা নিয়ে মতামত পেশ করেন। তিনি বলছেন,  কেন্দ্রীয় সংস্থার অস্তিত্ব ব্যতীত এবং স্থানীয়ভাবে বিপ্লবী সংগঠনের দুর্বল অস্তিত্ব থাকা মানে, এটি, বস্তুত, তা সন্ত্রাস মাত্রে পর্যবশিত হতে পারে।( Without a central body and with the weakness of local revolutionary organisations, this, in fact, is all that terror can be.)।
তিনি তৎকালীন তাদের সংগঠনের অবস্থার প্রেক্ষিতে ‘আক্রমণ হানো(To the assault)’ এই পন্থা ব্যবহারের পরিবর্তে ‘শত্রুর দুর্গকে ঘেরাও(Lay siege to the enemy fortress)‘ করার জন্য কর্মসূচি নিতে আহ্বান জানান। এরপরই তিনি লিখেন, পার্টির বিদ্যমান সমগ্র শক্তিকে এখনই আক্রমণের জন্য আহ্বান জানানো বর্তমান সময়ের করণীয় কর্তব্য হতে পারে না। কথায় নয় বরং কাজে বা বাস্তবে আন্দোলন পরিচালনায় সমর্থ এবং সকল শক্তিকে ঐক্যবদ্ধ করতে সমর্থ একটি বিপ্লবী সংগঠন গড়ে তোলার কাজ সম্পন্ন করা বর্তমান কর্তব্য হয়ে দাড়িয়েছে।
এরপর তিনি একটি প্রকাশনা বা প্রচারণামূলক পত্রিকার প্রয়োজনীয়তা কথা তোলেন। এই প্রকাশনার মাধ্যমে সারা রাশিয়ার নেটওয়ার্ক সৃষ্টি করা যাবে বলে মত দেন।
সর্বশেষে তিনি বলছেন,
আমরা নিরন্তরভাবে ধারাবাহিক ও পরিকল্পিত প্রস্তুতির কথা বলে আসছি। এবং এটা আমাদের চিন্তায় নেই যে  শুধুমাত্র নিয়মিত আঘাত অথবা সংগঠিত আক্রমণের মাধ্যমে স্বেচ্ছাচারীর পতন ঘটানো সম্ভব। এই ধরণের চিন্তা বা দৃষ্টিভঙ্গী হাস্যকর এবং গোঁড়ামীপূর্ণ।
অপরদিকে যথার্থতই এটা সম্ভব এবং ঐতিহাসিকভাবে অধিকতর সম্ভবপর যে, স্বেচ্ছাচার বা স্বৈরাচারিতার পতন হবে একটা স্বতস্ফূর্ত ঝাঁকুনি বা একটা অপ্রত্যাশিত রাজনৈতিক জটিলতার চাপে যা নিরন্তরভাবে প্রতিনিয়ত তাকে সকল দিক থেকে আশংকার মধ্যে রেখেছে।
তিনি আরো বলছেন,
কোনো রাজনৈতিক সংগঠনই জুয়াড়ীর মতো কোনো বিস্ফোরণ বা জটিলতা সৃষ্টির আশাকে ভিত্তি করে  তার কাজ চালাতে পারে না। যতই অপ্রত্যাশিত বা নিয়তি কিছুর উপর আমরা নির্ভরতা কমাতে পারবো ততই ‘ঐতিহাসিক মোড় ‘ ফেরানোর সময়ে আমরা অসচেতন বা অসাড় হয়ে কম থাকতে পারবো।
দ্রস্টব্য:  লেখাটি মার্ক্সিস্টস.অর্গ ওয়েবসাইট-এর Where to Begin? শীর্ষক লেনিনের লেখা থেকে সংক্ষেপ করে ভাবানুবাদ আকারে লেখা হয়েছে। পার্বত্য চট্টগ্রামকে প্রেক্ষিত বিবেচনা করে লেখার অবতাড়না করা হয়েছে।
অনুবাদে দুর্বলতা থাকা স্বাভাবিক।