Tuesday, September 9, 2014

মাও সেতুঙ, তার জীবন এবং চীন বিপ্লব



মাও সেতুঙের প্রথম জীবন
মাও সেতুঙ বা মাও জে ডঙ হলেন নয়া চীনের প্রতিষ্ঠাতা। চীনের কম্যুনিস্ট বিপ্লব তার নেতৃত্বে সংগঠিত হয়। তার জন্ম ১৮৯৩ সালের ২৬ ডিসেম্বর মধ্য চীনের হুনান প্রদেশের শাওশাঙ বা শাওশান জেলার শাউশাঙচুঙ নামে এক গ্রামে। তার পিতা ছিলেন একজন কৃষক। পরিশ্রম করে তার পিতা মোটামুটি অবস্থাপন্ন এক কৃষকে পরিণত হন।
মাওয়ের পিতার নাম মাও ইয়্যাচেঙ(Mao Yichang)। মায়ের নাম ওয়েন কুইমেই(Wen Qimei)।
মাওসেতুঙের পিতা তার ছেলেকে ছোটোকাল থেকেই  চাষের কাজে নিয়োগ করেছিলেন। লেখাপড়ার ফাকে ফাকে তাকে চাষের কাজে সময় দিতে হতো।
৮ বছর বয়সে মাও সেতুঙ গ্রামের এক প্রাথমিক বিদ্যালয়ে লেখাপড়া করেন। সেখানে তিনি চীনের প্রাচীন সাহিত্য, গল্প, রূপকথা ইত্যাদিও পড়ার সুযোগ পান। মাও পাঠ্য বই ছাড়াও অন্য বই পড়ার চেষ্টা করতেন। কিন্তু এ সময় তার শিক্ষক তাকে পাঠ্য বইয়ের বাইরে অন্য বই পড়তে দিতেন না।
তার বয়স যখন ১৩ তখন তার পিতা তাকে লুও ইগু( Luo Yigu) নামে ১৭ বছরের এক মেয়ের সাথে বিয়ে দেন। তবে মাও সেতুঙ এই বিয়ে মেনে নেননি। পরে আর মাওয়ের সাথে লুও ইগুর দেখা হয়নি। লুও ইগু ১৯১০ সালে মারা যান।

নতুন পরিস্থিতির সাথে পরিচিতি লাভ করেন মাও সেতুঙ
১৩ বছর বয়সে মাও প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পাঠ শেষ করেন এবং গ্রামের স্কুল ছেড়ে শহরের একটি স্কুলে পড়ার সুযোগ লাভ করেন। সেই স্কুলে থাকার সময় তিনি পাঠ্য বই ছাড়াও অন্য বই পড়ার সুযোগ লাভ করেন। এই সময়েই তিনি চীন সম্পর্কে জানতে শুরু করেন। বিশাল চীন তখন খন্ডে খন্ডে বিভক্ত করে শাসন করছে বিভিন্ন দখলদার শক্তি। এছাড়া চীন তখন ছিলো অত্যাচারী সামন্তীয় শাসকদের পদানত। চীনের জনগণ এই শাসন শৃঙ্খলের নাগপাশ থেকে বেরিয়ে আসতে বিভিন্ন স্থানে তখন সংগ্রাম করছিল। বিভিন্ন স্থানে প্রতিরোধ সংগ্রাম তখন চলছিলো।
হুনানে দুর্বিক্ষ শুরু হয়। এসময় হুনান প্রদেশের রাজধানী চাঙশাতে তার বিরুদ্ধে বিক্ষোভ চলে। সরকার  শক্তি প্রয়োগ করে এই বিক্ষোভ দমন করে এবং বিদ্রোহের নেতাদের শাস্তি দেয়। এই সময় মাও বিক্ষোভকারীদের পক্ষে ছিলেন। এই ঘটনা তার মনে রেখাপাত করেছিল।
তার যখন বয়স ১৬ তখন তিনি ডঙশানে একটি স্কুলে ভর্তি হন। সেখানে তিনি কৃষকের ছেলে হিসেবে তাকে হেনস্থার শিকার হতে হয়।
পরে তিনি হুনানের রাজধানী চাঙশাতে একি মিডল স্কুলে ভর্তি হন। সেখানে তখন বিপ্লবী পরিস্থিতি বিরাজ করছিলো।
এই সময় ১৯১১ সালে চীনে জাতীয়তাবাদী নেতা সান ইয়াৎ সেন তুঙমেঙহুই সোসাইটি প্রতিষ্ঠা করে আন্দোলন চালিয়ে যাচ্ছিলেন। মাও চাঙশায় সান ইয়াৎ সেন-এর সম্পাদনায় প্রকাশিত পত্রিকা ’দ্য পিপলস ইন্ডিপেন্ডেন্টস বা মিনলি বাও’ মনোযোগ দিয়ে পড়তেন।
এই সময়ে সান ইয়াৎ সেন-এর পক্ষ হয়ে কুিইঙ সাম্রাজ্যের বিরোধীতা চীনের দক্ষিণে সশস্ত্রবাহিনী ক্ষমতা কেড়ে নেয়। এই বিপ্লব শিঙহাই বিপ্লব বা ১৯১১ সালের চীনা বিপ্লব হিসেবে পরিচিত। চাঙশা শহরও সান ইয়াৎ সেন সমর্থিত বাহিনী দখলে নেয়। মাও সেতুঙ সৈন্যবাহিনীতে ভর্তি হন। ৬ মাস পর্যন্ত তিনি সৈন্যবাহিনীতে ছিলেন।
১৯১২ সালে তিনি সমাজতন্ত্র সম্পর্কে কিছু ধারণা অর্জন করেন।
সৈন্যবাহিনীরি সদস্যপদ থেকে অবসর নেবার পরে মাও সেতুঙ কিছুদিন লেখাপড়ায় ইস্তফা দিয়ে চাঙশা লাইব্রেরিতে নানাধরণের বই পড়তে থাকেন। এ সময় তিনি বিবর্তনবাদের প্রবর্তক ডারউইন, অর্থনীতিবিদ এডাম স্মিথ, দার্শনিক রুশো, স্পেনসার, মিল প্রমুখের লেখা পড়েন। মাওয়ের পিতা তার ছেলের ‘ছন্নছাড়া মতি’ বা প্রাতিষ্ঠানিক ’পড়ালেখার প্রতি’ মাওয়ের অনীহা দেখে তাকে টাকা পাঠানো বন্ধ করে দেন।
বিপ্লবে দীক্ষিত হতে হলে শারীরিক সক্ষমতা অর্জন করতে হবে
এরপর মাও হুনানের ফোর্থ নরমাল স্কুলে ভর্তি হন(পরে এই স্কুলটি হুনানে সবচেয়ে ভালো স্কুল প্রথম নরমাল স্কুলের সাথে একিভুত হয়)।  নরমাল স্কুলের পড়ার সময় মাও সেতুঙ সে সে স্কুলের অধ্যাপক ইয়াঙ চাঙজি(Yang Changji )-র সাথে পরিচিত হন। ইয়াঙ চাঙজি চেন তু সিউ কর্তৃক প্রকাশিত নিউ ইয়ুথ পত্রিকা মাওকে পড়তে দেন। চেন তু সিউ তখন পিকিঙ বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপক ছিলেন। চীনকে অন্ধ কুসংস্কার ও সামন্তীয় স্বেচ্ছাচারিতা থেকে মুক্ত হতে হলে পশ্চিমা বিশ্বের জ্ঞান বিজ্ঞান অর্জন করতে হবে বলে চেন তু সিই তার লেখায় মত দিতেন।
মাও সেতুঙ নিউ ইয়ুথ পত্রিকায় প্রথম একটি প্রবন্ধ লেখেন। তার লেখায় তিনি বিপ্লবে দীক্ষিত হতে হলে প্রথমে শারীরিক সক্ষমতা অর্জনের চেষ্টা করার দিকে গুরুত্ব আরোপ করেন। তিনি চাঙশা’র সোসাইটি ফর দ্য স্টাডি অব ওয়াঙ ফুজি নামে এক সংগঠনের সাথে যুক্ত হন।
একবার মাও তার দুই বন্ধুকে সাথে নিয়ে শীতের দিনে বাইরে কয়েকদিন কাটিয়ে দিতে বের হন। শীতের ঠান্ডা সহ্য করার ক্ষমতা অর্জন করার জন্য তিনি তা করেন। স্কুলে থাকার সময় তিনি ছাত্র সংগঠনের সংগঠক হিসেবেও কাজ করেন। ১৯১৮ সালের এপ্রিলের দিকে পিপলস স্টাডি সোসাইট গঠন করে তিনি চেন তু সিউ’র দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে আলোচনার সূত্রপাত করেন। তাদের এই সংগঠনের সদস্য সংখ্যা ছিলো প্রায় ৭০/৮০ জন। পরে তাদের অনেকেই চীনা কম্যুনিস্ট পার্টিতে যুক্ত হয়ে কাজ করেন। মাও ১৯১৯ সালের জুন মাসে গ্র্যাজুয়েট ডিগ্রি লাভ করেন।
মাও পিকিঙ বিশ্ববিদ্যালয়ে কিছুদিনের জন্য সহকারী লাইব্রেরিয়ান হিসেবে চাকুরি করেন
ইয়াঙ চাঙজি’র সহায়তায় মাও সেতুঙ পিকিঙ বিশ্ববিদ্যালয়ে সহকারী লাইব্রেরিয়ান হিসেবে একটি চাকুরি পান। সেখানে থাকার সময় তিনি লি তা চাও পরিচালিত স্টাডি গ্রুপের সাথে জড়িত হন। এছাড়া তিনি দর্শন ও সাংবাদিকতা নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ে যে লেকচার দেয়া হতো সে সকল ক্লাসে অংশ নিতেন।
মাও সেখানে খুব কম বেতন পেতেন। তিনি ছাত্রদের সাথে গাদাগাদি করে থাকতেন।
মাও সেতুঙ সেখানে কিছুদিন থাকার পরে সাংহাই আসেন। এবং সেখান থেকে তার মায়ের অসুখের খবর পেয়ে তিনি তার গ্রাম শাওশানে চলে যান। তার মা ওয়েন কুইমেই ১৯১৯ সালের অক্টোবরে মারা যান। পিতা মাও ইয়্যাচেঙ ১৯২০ সালের জানুয়ারি মারা যান।
চীনের ছাত্র আন্দোলন মে ফোর্থ মুভমেন্ট
মাও শাওশান থেকে ফিরে চাঙশাতে জিইয়্যে প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ইতিহাসের শিক্ষক হিসেবে নিয়োগ পান। তখন দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শেষ হয়েছে। বিজেতা ফ্রান্স, ইংল্যান্ড, আমেরিকা
জাপানকে সাথে নিয়ে চীনকে লুটপাট করার জন্য বা পদানত রাখার জন্য কয়েকভাবে বিভক্ত করে নিজেদের মধ্যে ভাগ করার জন্য তখন ব্যস্ত। চীনের পক্ষ থেকে যুদ্ধবাজ ডুয়ান ছিলো তাদের মিত্র। কিন্তু বেইজিঙে ছাত্ররা বাধ সাধলো। তারা মে ফোর্থ মুভমেন্ট নামে এক বিরাট আন্দোলন শুরু করে দিলো। তারা ঘোষনা দিলো, চীনকে বিভক্ত করে শাসন শোষন করা যাবে না। বে্েজিঙে যখন আন্দোলন ধর্মঘট চলছে মাও তখন হুনানের চাঙশায় ছাত্রদের ঐক্যবদ্ধ করার জন্য হুনানের ছাত্র সমিতি’র ব্যানারে কাজ শুরু করে দিয়েছেন। জিয়াঙ রিভার রিভিউ নামে এক প্রকাশনা তিনি তখন প্রকাশ করেন।এছাড়া মাও সেতুঙ নয়া হুনান ও জাস্টিস নামে একটি স্থানীয় পত্রিকায় লেখালেখি শুরু করেন।
তিনি নারী অধিকারের পক্ষে লিখেন। বিশেষ করে তার অমতে তার পিতা-মাতা তার ১৩ বছর বয়সে এক নারীর সাথে বিয়ে দেয়ার ঘটনায় তিনি নারী অধিকারের প্রতি সচেতন হন।
হুনানের শাসক চাঙ জিঙগায়ো ছাত্র সংগঠনের কার্যক্রম নিষিদ্ধ করে দেন।
১৯১৯ সালে ডিসেম্বরে হুনানে এক ধর্মঘট আহ্বান করা হয়। মাও তাতে সক্রিয় ভুমিকা রাখেন।  হুনানের শাসকগোষ্ঠী মাও তার গড়া ছাত্র সংগঠনের প্রতি রুষ্ট হয়ে ওঠে। মাও আবার বেইজিঙ চলে যান। সেখানে তিনি কম্যুনিস্ট মেনিফেস্টো পড়ার সুযোগ লাভ করেন। চেন তু সিউ’র সাথে পরিচিত হবার পরে তিনি সেখানে মার্কসিস্ট দর্শনের প্রতি আকৃষ্ট হন।
কিছুদিন পরে সাংহাই চলে আসেন। সেখানে তিনি কুওমিনতাঙ নেতাদের সাথে পরিচিত হন।  সেখানে কুওমিনতাঙের একজন পরিচিতি জাতীয়তাবাদী ইয়ে পেইজি’র সাক্ষাত লাভ করেন। তার মাধ্যমে জেনারেল টান ইয়ানকাইয়ের সাথে তিনি পরিচিত হন। তান ইয়ানকাই কিছুদিন পরে ১৯২০ সালের জুনের দিকে হুনানের সীমান্ত গুয়াঙডঙ এলাকা দিয়ে আক্রমণ করে হুনানে চাঙ শাসককে বিতাড়িত করেন। মাও তাতে সহায়তা দেন। তান ক্ষমতায় আসলে মাও প্রথম নরমাল স্কুলের জুনিয়র বিভাগের প্রধান শিক্ষক হিসেবে চাকুরি পান। চাকুরি পেয়ে কিছুটা আর্থিক স্বচ্ছলতা আসলে তিনি ইয়াঙ কাই হুই নামে একজনকে বিয়ে করেন। সময়টা তখন ১৯২০ সালের শীতকাল।
Mao Zedong
চীনা কম্যুনিস্ট পার্টি গঠন করা হলো
১৯২১ সালে জুলাই মাসের ২৩তারিখ সাংহাইতে চীনা কম্যুনিস্ট পার্টি গঠন করা হয়। চীনের বিভিন্ন এলাকায় সক্রিয় মার্কসিস্টস গ্রুপগুলো একত্রিত হয়ে এই পার্টি গঠন করে। সাংহাই, বেইজিঙ, ক্যান্টন, উহান, জিনান, হুনান বা চাঙশা, হুপেই এলাকায় যেসকল কম্যুনিস্ট স্টাডি গ্রুপ ছিলো তারা সাংহাইতে মিলিত হয়। প্রথমে তারা সাংহাইয়ের একটি বালিকা বিদ্যালয়ের শ্রেনীকক্ষে তাদের সভার আয়োজন করার চেষ্টা করে। পরে গোয়েন্দা নজরদারীতে ধরা পড়ার আশংকা দেখা দিলে চিয়াশিঙের দক্ষিণ হ্রদে একটি নৌকায় উঠে তারা তাতে ভেসে ভেসে প্রথম কংগ্রেস অনুষ্ঠান আয়োজন করা হয়। মোট ১৩ জন প্রতিনিধি তাতে উপস্থিত ছিলেন। মাও সেতুঙ ও তখন উপস্থিত ছিলেন। এই কংগ্রেসে কেন্দ্রীয় কমিটির সম্পাদক হিসেবে চেন তু সিউকে নির্বাচিত করা হয়। মাও সেতুঙ হুনানে পার্টি সংগঠনকে গতিশীল করার দায়িত্ব পান।
কংগ্রেস থেকে ১৯২১ সালে আগস্টের দিকে হুনানে ফিরে মাও হুনানে কম্যুনিস্ট পার্টির সংগঠন শক্তিশালী করতে মাঠে নেমে পড়েন। তিনি এই সময় নিরক্ষরতা দূরীকরণের অভিযানেও সক্রিয় হন। শ্রমিকদের সংগঠিত করে ধর্মঘট করেন। কৃষকদের ঐক্যবদ্ধ করতেও তিনি কাজ করেন।
১৯২২ সালে কম্যুনিস্ট পার্টির দ্বিতীয় কংগ্রেস আবার সাংহাইতে অনুষ্ঠিত হয়। কিন্তু যাবার সময় পথে কংগ্রেস অনুষ্ঠিত হবার ঠিকানা হারিয়ে ফেললে তিনি তাতে যোগদান করতে পারেননি।
১৯২৩ সালের জুন মাসে তৃতীয় কংগ্রেস আয়োজন করা হয় সাংহাইতে । তখন কংগ্রেসে সিদ্ধান্ত নেয়া হয় যে, কুওমিনতাঙের সাথে কম্যুনিস্ট পার্টি ঐক্যবদ্ধ হয়ে কাজ করবে। আর একই সাথে কম্যুনিস্ট-কুওমিনতাঙ একত্রিত হয়ে উত্তরের যুদ্ধবাজ নেতাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করবে।
তখন পার্টিতে চ্যাঙ কুও তাও বাম হঠকারিতার লাইন ধরে যুক্তফ্রন্ট গঠনের বিরোধিতা করেন। অন্যদিনে চেন তু সিউ কুওমিনতাঙের অন্তর্ভুক্ত হয়ে পার্টিকে বিলুপ্ত করার কথা বলেন। মাও এই দুই লাইনের সমালোচনা করেন। তৃতীয় কংগ্রেসে মাও সেতুঙ কেন্দ্রীয় সদস্য হিসেবে অন্তর্ভূক্ত হন। পার্টির সদস্য সংখ্য তখন ছিলো ৩৪২ জন।
এই সময় লিও শাও চি ও চেন ইউনের নেতৃত্বে শহরকেন্দ্রীক শ্রমিক আন্দোলন ব্যর্থতায় পর্যবসিত হয়।
১৯২১ ও ১৯২৩ এর মধ্যে মাও সেতুঙ লিখিত গুরুত্বপূর্ণ  প্রবন্ধসমূহ হলো-
(ক) কম্যুনিজম এন্ড ডিক্টেটরশিপ, ১৯২১
(খ) দ্য রোল অব দ্য মার্চেন্টস ইন দ্য ন্যাশনাল রেভ্যলুশন, ১৯২৩
(গ) দ্য চাইনিজ গভার্নমেন্ট এন্ড দ্য ফরেনার্স; ২৯ আগস্ট, ১৯২৩।

সান ইয়াৎসেন এর গড়া কুওমিনতাঙ পার্টির প্রথম জাতীয় কংগ্রেস
সান ইয়াৎ সেন-এর গড়া কুওমিনতাঙ পার্টির প্রথম জাতীয় কংগ্রেস অনুষ্ঠিত হয় ১৯২৪ সালের প্রথম দিকে গুয়াঙজৌ-তে। নতুন গঠন করা কেন্দ্রীয় কমিটিতে মাও সেতুঙ বিকল্প কেন্দ্রীয় সদস্য হিসেবে নির্বাচিত হন।উক্ত কংগ্রেসে চীনের কম্যুনিস্ট পার্টির প্রতিনিধি হিসেবে লি তা চাও, লিন পো , মাও সেতুঙ প্রমুখ অংশগ্রহণ করেন। কংগ্রেসের অধিবেশনে কুওমিনতাঙ তিনটি মৌলনীতি গ্রহণ করে। এসব নীতিসমূহ হলো-
(ক) রাশিয়ার সাথে মৈত্রী।
(খ) চীনের কম্যুনিস্ট পার্টির সাথে মৈত্রী।
(গ) কৃষক-শ্রমিকদের অধিকার আদায়ের সংগ্রামকে সমর্থন।
কংগ্রেস শেষ হবার পরে মাও কুওমিনতাঙ মাওকে কৃষক আন্দোলন ট্রেনিঙ ইন্সটিটিউট পরিচালনার দায়িত্ব প্রদান করে। এছাড়া পলিটিক্যাল উইকলি নামে একটি প্রোপাগান্ডা নিউজ লেটার ছাপানোরও দায়িত্ব তাকে দেয়া হয়। কুওমিনতাঙ থেকে এই দায়িত্ব পাবার পরে মাও সেতুঙ হুনানের কৃষকদের সংগঠিত করা শুরু করেন। এসময় তিনি তাদের সামরিক প্রশিক্ষণও দিতে থাকেন। একই সাথে সমাজতান্ত্রিক বা বাম ধারার বই প্রকাশনা যেন সাধারণ জনগণ পাঠ করতে পারে তার ব্যবস্থা গ্রহন করেন।
১৯২৫ সালের মে মাসে সান ইয়াৎ সেন মারা যান। কুওমিনতাঙে ক্ষমতার পালাবদল শুরু হলে ডানপন্থী চিয়াঙ কাইশেক ক্ষমতা দখলে নেয়।
তবে তখনো চিয়াঙ কুওমিনতাঙ পার্টির পুরো কর্তৃৃ্ত্ব নিতে পারেনি।
 চীনা কম্যুনিস্ট পার্টির ৪র্থ জাতীয় কংগ্রেস
১৯২৫ সালের জানুয়ারি মাসে চীনা কম্যুনিস্ট পার্টির ৪র্থ জাতীয় কংগ্রেস অনুষ্ঠিত হয়। এতে মাও সেতুঙ কেন্দ্রীয় সদস্যপদ থেকে বাদ পড়েন।  তখন চীনা কম্যুনিস্ট পার্টিতে সদস্য সংখ্যা ছিলো ৯৯৫ জন।
উত্তরে যুদ্ধবাজ শাসকদের বিরুদ্ধে অভিযান
কুওমিনতাঙ কেন্দ্রীয় নির্বাচন পরিষদের এক সভায় চীনের উত্তরে যুদ্ধবাজ সামন্তীয় শাসকদের বিরুদ্ধে এক সামরিক অভিযান করার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। কুওমিনতাঙ-কম্যুনিস্ট মিলিত শক্তি এই ইতিহাসখ্যাত অভিযান পরিচালনা করে। জাতীয় বিপ্লবী বাহিনীর নামে পরিচালিত এই অভিযানে কম্যুনিস্ট পার্টি রাজনৈতিকভাবে নেতৃত্ব প্রদান করে।
শাহরিয়ার কবির কমরেড মাও সেতুঙ বইয়ে লেখেন-
“ ব্যাপক কৃষক শ্রমিকদের সক্রিয় সমর্থনে ১৯২৬ সালের শেষের দিকে এবং ১৯২৭ সালের প্রথম দিকে জাতীয় বিপ্লবী বাহিনী যুদ্ধ চালিয়ে দ্রুত ইয়াংসি ও হোয়াংহো নদী অববাহিকায় পৌছায়। ক্রমশ তারা অর্ধেক চীন দখল করে।” (পৃষ্ঠা-৩৬)
কিন্তু কম্যুনিস্ট পার্টি ক্রমশ শক্তি অর্জন করতে শুরু করলে সাম্রাজ্যবাদী শক্তি প্রমাদ গুনতে শুরু করে। তারা চিয়াঙ কাইশেককে সহযোগিতা করে কুওমিনতাঙে প্রতিবিপ্লবী ক্যুদেতা ঘটায়। ১৯২৭ সালের এপ্রিলে চিয়াঙ ক্ষমতা দখল করে। কম্যুনিস্ট পার্টির তৎকালীন নেতা চেন তু সিউ বিলোপবাদী বা ডান সুবিধাবাদী লাইন অনুসরণ করেন। তিনি সশস্ত্রবাহিনীর নেতৃত্ব ক্ষমতা বর্জন করেন। ফলে বিপ্লবী যুদ্ধের মাধ্যমে এতদিন কম্যুনিস্ট পার্টি যে শক্তি অর্জন করে তা ব্যর্থতায় পর্যবসিত হয়।
 ১৯২৪ থেকে ১৯২৬ সালে মধ্যে মাও সেতুঙ রচিত লেখার মধ্যে অন্যতম হলো-
(ক) অ্যানালাইসিস অব দ্য ক্লাশেস ইন চায়না সোসাইটি বা বাংলা চীনা সমাজের শ্রেনী বিশ্লেষণ ; মার্চ, ১৯২৬।
(খ) দ্য বিটার সাফারিংস অব দ্য পিজ্যান্টস ইন কিয়াঙসু , চেকিয়াঙ এন্ড দেয়ার মুভমেন্টস অব রেজিস্ট্যান্স; নভেম্বর, ২৫, ১৯২৬।
১৯২৭ সালের মে মাসে উহানে কম্যুনিস্ট পার্টির ৫ম কংগ্রেস
লড়া্ইয়ের মধ্য দিয়ে মাও পোড় খাওয়া ও আত্মবিশ্বাসী হয়ে উঠতে শুরু করেছেন
উহানে যখন পার্টির ৫ম কংগ্রেম অনুষ্ঠিত হয় তার আগে থেকেই মাও সেতুঙ পার্টিতে বিভিন্ন প্রকাশনার মাধ্যমে শুধুমাত্র শ্রমিক-মধ্যবিত্ত শিক্ষিতদের উপর নির্ভরশীল আন্দোলন না করে কৃষকদের সাথে ঐক্য গড়ে তোলার উপর গুরুত্ব দিয়ে আলোচনা ও বিতর্কের সূত্রপাত ঘটান। চেন তু সিউ এই মতের বিপক্ষে ছিলেন। মাওয়ের চীনা সমাজের শ্রেনী বিশ্লেষণ লেখাটির তাত্ত্বিক বক্তব্য চেন তু সিউ প্রত্যাখ্যান করেন। চেন বিপ্লবী লড়াইয়ে কৃষকদের ভুমিকা খাটো করে দেখতেন।
১৯২৭ সালের ০৪ জানুয়ারি মাও হুনানের ৫টি জেলার কৃষক আন্দোলনের উপর তদন্ত করার দায়িত্বপ্রাপ্ত হন। তিনি এ নিয়ে বিখ্যাত প্রবন্ধ ’হুনানের কৃষক আন্দোলনের তদন্ত রিপোর্ট’ রচনা করেন। ১৯২৭ সালের আন্ত্ প্রাদেশিক কৃষক সম্মেলনে তিনি এই থিসিসি বা প্রবন্ধ উত্থাপন করেন। ৫ম কংগ্রেসে এই থিসিস দলিল আকারে উত্থাপনের সিদ্ধান্ত সেখান থেকে নেয়া হয়।
মাও তার থিসিসে লেখেন-
A revolution is not a dinner party, or writing an essay, or painting a picture, or doing embroidery; it cannot be so refined, so leisurely and gentle, so temperate, kind, courteous, restrained and magnanimous. A revolution is an insurrection, an act of violence by which one class overthrows another.
— From Report on an Investigation of the Peasant Movement in Hunan
৫ম কংগ্রেসে মাও পার্টির মধ্যে মতদ্বৈধতা প্রকাশিত হয়। চেন তু সিউ চাইছিলেন কুওমিনতাঙের মধ্যে পার্টিকে মিশিয়ে দিতে। তিনি মাওয়ের লাইনকে ভুল মনে করেন। কোনো প্রকার সুনির্দিষ্ট সিদ্ধান্ত গ্রহণ ছাড়াই ৫ম কংগ্রেস সমাপ্ত হয়।
কিন্তু এদিকে মাও সেতুঙ হুনানে এসে কৃষক আন্দোলন শুরু করেন। তিনি নিখিলি চীন কৃষক ইউনিয়নের সভাপতি নির্বাচিত হন।
বিভিন্ন স্থানে কৃষক আন্দোলনের বিস্তৃতি ঘটে।
এদিকে ১৯১২৭ সালেই কুওমিনতাঙ কম্যুনিস্টদের সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করল এবং বিভিন্ন স্থানে কম্যুনিস্ট দমনের উদ্যোগ গ্রহণ করল।
কুওমিনতাঙের মধ্যে যারা কম্যুনিস্ট ভাবাপন্ন তারা কুওমিনতাঙের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষনা করলো। ১৯২৭ সালের ১ আগস্ট বিদ্রোহের দিন ধার্য্য করা হলো। স্থান নানচাঙ নগরী। বিদ্রোহের নেতৃত্বে ছিলেন চু তেহ, হো লুঙ, ইয়ে তিঙ, লিন পিয়াও, লিউ পো চেঙ প্রমুখ। পরবর্তিতে তারা সমরকুশলতায় খ্যাতি অর্জন করেছিলেন।
এদিকে ০৭ আগস্ট হ্যাঙকা্উতে কম্যুনিস্ট পার্টি জরুরি অধিবেশনে বসলো। সেখানে শ্রেনী আপোষের অভিযোগে চেন তু সিউকে পার্টি সম্পাদকের পদ থেকে অপসারণ করা হয়। তার বদলে চু চিউ পাই-কে পার্টির সম্পাদক নির্বাচন করা হয়।  এবারের কংগ্রেসে মা্ও পলিটব্যুরো সদস্য নির্বাচিত হলেন। এছাড়া হুনানে আন্দোলন সংঘটনে ভুমিকা রাখারও দায়িত্ব তাকে দেয়া হলো।
এবার মাও কৃষক-শ্রমিক-খনি শ্রমিক ও কুওমিনতাঙের বিদ্রোহী সৈন্যদের বিশাল শক্তি নিয়ে অভ্যুত্থানের সৃষ্টি করলেন। গঠিত হলো প্রথম শ্রমিক কৃষক বাহিনীর প্রথম ডিভিশন। ডিভিশন গঠনের পরে মাও এই সামরিক শক্তির পার্টি ফ্রন্টের সভাপতি হন। চিয়াঙ এই বাহিনীকে আক্রমণ করে পর্যুদস্ত করল।
নানা সমালোচনা ধৈর্য ধরে সহ্য করে তিনি বাহিনীকে আবার ডিভিশনে উন্নীত করলেন। তিনি চিঙকাঙশানে শক্তিশালী ঘাটি স্থাপন করলেন। ১৯২৮ সালের মে মাসে চু তেহ চিঙকাঙশানে এসে মাওয়ের সাথে মিলিত হন। তারা গঠন করেন চতুর্থ লাল ফৌজ।  মাও চু তেহ কে সাথে নিয়ে সোভিয়েত এলাকা সম্প্রসারণের দিকে মনোযোগ দেন।
চিয়াঙ চিঙকাঙশানে আক্রমণ করলেন। সেখান থেকে মাও ও চু তেহ সরে আসলেন।
চিঙকাঙশান থেকে সরে এসে তারা কিয়াঙশি প্রদেশে সোভিয়েত গঠনের উদ্যোগ নেন।
চলমান…

No comments:

Post a Comment