Tuesday, February 9, 2016

সিরাজ সিকদারের সর্বহারা পার্টিঃ প্রেক্ষিত পার্বত্য চট্টগ্রাম

তারিখঃ ১২ জানুয়ারি, ২০১৬
মিঠুন চাকমা
পারিবারিক অভিজ্ঞতা জ্ঞাপন
আমার দাদীর বাড়ি রাঙামাটির লুঙুদু উপজেলার মাহজনপাড়া গ্রামে।বলে রাখি তিনি লেখাপড়া করেননি।তার সময়ে মেয়েদের লেখাপড়া করা বারণ ছিল। তাই সবাই স্কুলে যাবার সময়ে তিনি হয় রান্নাঘরের চুলা সামলাতে মায়ের সহকারী হয়েছেন নতুবা ঘরের নানা কাজে সহযোগিতা করেছেন।তার সাথে আলাপ করার সময় তার বাপের বাড়িতে ঘটা একটি ঘটনার কথা তিনি স্মরণ করছিলেন।তখন তিনি দাদুর বাড়িতে স্ত্রী হিসেবে চলে এসেছেন এবং কয়েকজন ছেলেপিলেও তার হয়েছে।একদিন তিনি জানতে পারেন তাদের গ্রামে তার পিতার ঘর  ‘সর্বহারা’রা লুট করেছে। সর্বহারা নামে যারা এই ঘটনা ঘেটিয়েছিল তারা লুট করেছিল ধানের গোলা থেকে ধান, টাকা পয়সা যা ছিল ও তাদের ঘরে যে সকল কাপড়চোপড় ছিল সবকিছু।তিনি জানাচ্ছিলেন, তার মা বেশ কষ্ট করে বেইন বুনে বুনে পিনন ও খাদি (চাকমা নারীদের পরনের পরিধান)বুনতেন। এবং তা একটি পুটলি বা বোাঁচকায় রেখে দিতেন। সর্বহারা’রা যেদিন লুট করতে আসল সেদিন তার মা পিনন ও খাদি’র সেই পুটলি যেন লুটের হাত থেকে বাাঁচাতে পারেন তার জন্য তা ঘরের বাইরে পাহাড়ের নিচে ছুড়ে দিয়েছিলেন। কিন্তু সর্বহারা’রা তাও কুড়িয়ে নিয়ে যায়। লুটের পরে তার মায়ের পড়নের কাপড় ছাড়া কিছুই ছিল না। তাকে অন্যজন থেকে কাপড় চেয়ে নিতে হয়েছিল। পরে তিনি নিজে তার মায়ের জন্য পিনন বা পরনের কাপড় পাঠিয়ে দেন।
সর্বহারারা কেন মাহজনপাড়া গ্রামে আমার দাদী’র পিতার বাড়ি লুট করেছিল? এ বিষয়ে দাদী কিছু্ই বলতে পারেননি। কারণ তিনি কীই বা বুঝবেন শ্রেনীশত্রু-মহাজন শ্রেনী বিষয়ে! আমি তো অবাক হই এতদিন পরে তিনি কিভাবে এই ‘সর্বহারা’ শব্দটি মনে রাখতে পারলেন তা নিয়ে!
আদতে দাদী বা তাদের পিতার পরিবার কি বড়সড় কোনো জমিদার কেউ ছিলেন? অথবা ছিলেন অত্যাচারী জমিদার, জোতদার?
ধনসম্পত্তির দিক থেকে হয়ত তাদের অন্যজনের চেয়ে ভালো অবস্থান ছিল। কিন্তু পার্বত্য চট্টগ্রামের তৎকালীন প্রেক্ষাপটে ধনী বা জমিদার বলতে যা বোঝায় তা হল, ‘বজরঅ ভাদে পারানা’ বা একুনে ধানের যা উৎপাদন তা দিয়ে পুরো একটি বছর কাটিয়ে দিতে পারাই হলো তৎকালীন সময়ে ধনী বা থাউইএ(চাঙমা ভাষায় ধনী অর্থে বোঝাতে) বা জমিদার হিসেবে পরিচিতির বৈশিষ্ট্য।কিন্তু এটাও ঠিক যে এই জমিদার বা ধনী বা চাকমা ভাষায় থাউইএ শ্রেনীর লোকজনকে তাদের নিজেদের জমিতে নিজেদের গতরও খাটতে হতো।তারা বা এই শ্রেনী কাউকে অত্যাচার করতো কি না তা খুঁজতে হলে পাই পাই করে প্রতিজনের বিষয়ে বাস্তব ধারণা নিতে হবে। কিন্তু তারপরেও কি শ্রমিক শ্রেনীর কমিউনিস্ট বা বিপ্লবী রাজনীতিতে এই ‘মাঝারী ধনী’ বা ‘স্বচ্ছল ধ্বনী’ক শ্রেনীকে ‘শ্রেনীশত্রু’ তকমায় ফেলা যায়?
সম্ভবত, চীনে মাও সেতুঙের পিতা তারও চেয়ে অধিক ধনী বা বিত্তবান বা অধিক জমিদার ছিলেন। কিন্তু মাও সেতুঙ কি এই শ্রেনীকে ‘শত্রু’র কাতারে ফেলেছিলেন?
সর্বহারা পার্টি’র ‘পূর্ব বাংলার সমাজের শ্রেনী বিশ্লেষণ’ লেখাটি পড়লে বোঝা যাবে ‘দাদী’র পিতা কোন শ্রেনীতে পড়তেন। সম্ভবত, তারা বড়জোর ধনীক শ্রেনীর কাতারে অন্তর্ভুক্ত হতে পারেন।তবে ধনীক শ্রেনীর কাতারে পড়বেন কি না তা নিয়েও সন্দেহ রয়েছে। দাদী বলেছেন, তার পিতা খুব কষ্ট করে নিজে পরিশ্রম করে ‘আগাব ভুঁই’ চাষ অযোগ্য জমির মাটি কেটে কেটে চাষাবাদযোগ্য জমি প্রস্তুত করেছেন। খেটে খেটে জমির পরিমাণ বাড়িয়েছেন। এবং জমিতে তিনি যেমন মজুর নিয়োগ করতেন তেমনি নিজেও জমিতে শ্রম দিতেন। পরে তিনি এলাকায় মহাজন হিসেবে পরিচিতি লাভ করেন।
এই শ্রেনী সম্পর্কে বলা হচ্ছে-
‘সাধারণভাবে বলতে গেলে তারা পূ্র্ব বাংলার স্বাধীনতা সংগ্রামে কিছুটা ভুমিকা পালন করতে পারে এবং জমিদার বিরোধী ভূমি বিপ্লবী সংগ্রামে নিরপেক্ষ থাকতে পারে। এ কারণে আমরা ধনী চাষীদের জমিদার শ্রেনীভুক্ত করবো না এবং অপরিপক্কভাবে তাদের ধ্বংস করার নীতি নেব না।’(সূত্রঃ সিরাজ সিকদার রচনা সংগ্রহ, শ্রাবন প্রকাশনী; প্রকাশঃ ফেব্রুয়ারি, ২০০৯; পৃঃ ৫০।
মাও্ সেতুঙ তার ‘চীনা সমাজের শ্রেনী বিশ্লেষণ’ প্রবন্ধে জমিদার শ্রেনী ও মুৎসুদ্দী শ্রেনী ব্যতীত মাঝারী বুর্জোয়া শ্রেনী থেকে শুরু করে পাতি বুর্জোয়া, স্বত্ত্বাধিকারী কৃষক, মালিক-হস্তশিল্পী, ছাত্র-প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্কুলের শিক্ষক, অফিসের কেরানী, ছোট ব্যবসায়ী, দোকান কর্মচারী, ফেরী ‍ওয়ালা, আধা সর্বহারা, সর্বহারা শ্রেনী প্রমুখকে বিপ্লবে সম্পৃক্ত করার কথা বলেছিলেন। ছোট প্রবন্ধটির শেষে তিনি বলছেন-
‘সংক্ষেপে, এটা সুস্পষ্ট যে সাম্রাজ্যবাদের সঙ্গে যোগসাজশে লিপ্ত সমস্ত সমরনায়ক, আমলা মুৎসুদ্দি পুঁজিপতি শ্রেনী, বড় জমিদার শ্রেনী এবং তাদের সঙ্গে সংযুক্ত বুদ্ধিজীবীদের প্রতিক্রিয়াশীল অংশ হলো আমাদের শত্রু। শিল্পকারখানায় কর্মরত সর্বহারা শ্রেনীই হলো আমাদের বিপ্লবের নেতৃত্বস্থানীয় শক্তি। সমস্ত আধা সর্বহারা এবং পাতি বুর্জোয়া হলো আমাদের নিকটতম বন্ধু। দোদুল্যমান মাঝারী বুর্জোয়া শ্রেনীর দক্ষিণপন্থীরা আমাদের শত্রু হতে পারে এবং বামপন্থীরা আমাদের মিত্র হতে পারে- কিন্তু আমাদের সর্বদাই সতর্ক থাকতে হবে এবং তাদেরকে আমাদের ফ্রন্টের মধ্যে বিভ্রান্তি সৃষ্টি করতে দেয়া চলবে না।’
(পৃঃ ৯)
সুতরাং, শ্রেনী দৃষ্টিভঙ্গির দিক থেকে এই ‘ধনীক শ্রেনী’ বা গ্রাম্য ভাষায় ‘জমিদার শ্রেনী’র প্রতি বিপ্লবী পার্টির দৃষ্টিভঙ্গি কী হওয়া উচিত বা তাদের বিষয়ে কী কর্মসূচি প্রদান করা করণীয় তা নিশ্চয়ই স্পষ্ট হয়ে থাকবে। তাই নতুনভাবে আর ব্যাখ্যা প্রদান করার দরকার নেই বলে বিশ্বাস।
নিকটাত্মীয় স্থানীয় ব্যক্তির পরিবারের অভিজ্ঞতা বর্ণনা করে এত উদ্ধৃতি দেয়ার কারণ হলো পার্বত্য চট্টগ্রামে সর্বহারা পার্টির ভুমিকা বা তার রাজনৈতিক সাংগঠনিক কার্যকৌশল তথা বাস্তব কর্মসূচি বিষয়ে আলোকপাত করা এবং তা যে শ্রেনী আন্দোলন তথা কমিউনিস্ট আন্দোলনের দিক থেকে নানা দিক থেকে ভুল পথে পরিচালিত হয়েছে সেদিকে দৃষ্টি দেবার চেষ্টা করা। এখানে সিরাজ সিকদার বা তার পরিচালিত সর্বহারা পার্টিকে ‘তুলোধুনো’ করার জন্য এই কাজটি করা হচ্ছে না। এটা বলা প্রয়োজন যে, বিল্পবকে এগিয়ে নিতে হলে বিল্পবী পার্টিকেই ‘মূল্যায়নের’ মধ্যে আনতে হবে। সেদিক থেকে বিবেচনা করেই এই লেখা। সর্হারা পার্টি বা অন্য কোনো পার্টি যদি আদৌ বিপ্লবী পার্টি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হতে চায়, তবে সেই পার্টিকে এই ‘স্ক্রীনিং’এর ভেতর দিয়েই যেতে হবে। অর্থাৎ পার্টিকে অবশ্যই তার অতীত থেকে বা অতীতের ভুলভ্রান্তি থেকে বাস্তবভাবেই শিক্ষা নিতে হবে।
জাতি বা জাতিসমূহের অধিকার বিষয়ে গঠনতান্ত্রিকভাবে বা দলিলে সর্বহারা পার্টির অবস্থান
সর্বহারা পার্টির নিউক্লিয়াস সংগঠন পূর্ব বাংলা শ্রমিক আন্দোলন ১৯৬৮ সালের জানুয়ারি মাসে প্রকাশিত তাদের থিসিসে ‘জাতীয় জনগণতান্ত্রিক বিপ্লবের সাধারণ কর্মনীতি’ অংশে জাতি বা জাতিসত্তাসমূহের বিচ্ছিন্ন হবার অধিকারসহ স্বায়ত্তশাসন ও সাংস্কৃতিক ও ভাষাগত বিকাশের পূর্ণ সুযোগ দেয়ার কথা বলেছে।
এই কর্মনীতি’র ৯ ও ১০ নম্বর অংশে বলা হয়েছে-
‘৯. বিচ্ছিন্ন হবার অধিকারসহ বিভিন্ন সংখ্যালঘু জাতিকে স্বায়্ত্তশাসন ও বিভিন্ন উপজাতিকে আঞ্চলিক স্বায়ত্তশাসন দেয়া হবে।’
’১০. সকল অবাঙালী দেশপ্রেমিক জনগণের সাংস্কৃতিক ও ভাষাগত বিকাশের পূর্ণ সুযোগ দেয়া হবে।’
(সিরাজ সিকদার রচনা সংগ্রহ; পৃঃ ২৪)
কিন্তু পরে উক্ত সংগঠন পার্টি হিসেবে সর্বহারা পার্টি নাম ধারণ করে তার কাজ পরিচালনার সময় ১৯৭১ সালের সেপ্টেম্বর মাসে যে খসড়া সংবিধান প্রণয়ন করে তাতে সুস্পষ্টভাবে ‘জাতি বা জাতিসত্তাসমূহের জনগণের’ অধিকারের পক্ষে কোনো বাক্য বা বাক্যাংশ সংযুক্ত করা হয়নি।শুধুমাত্র প্রথম অধ্যায়ের সাধারণ কর্মসূচি’র ৪ নম্বর অংশে ‘নিপীড়িত জনগণ ও নিপীড়িত জাতির সঙ্গে ঐক্যবদ্ধ হয়ে’ ‘সমগ্র মানবজাতির মুক্তির জন্য সম্মিলিতভাবে সংগ্রাম’ চালানোর কথা বলা হয়েছে। (সিরাজ সিকদার রচনা সংগ্রহ; পৃঃ ১৩২)
এই খুবই নগন্য বা অস্পষ্ট তাত্ত্বিক সাংগঠিক বা কর্মর্সূচিগত অবস্থান পরে কী ধরণের ভ্রান্তিতে একটি দলকে নিপতিত করতে পারে আমরা পরে তা দেখবো। এবং এই ভ্রান্তির কারণে পার্বত্য চট্টগ্রামে অধিকারের লক্ষ্যে আন্দোলনরত সংগঠনের সাথে সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়া ও পার্বত্য চট্টগ্রাম থেকে সর্বহারা পার্টির নিশ্চিহ্ন হয়ে যেতে দেখবো।
এই শ্রেনী বিশ্লেষণ বাদেও পার্বত্য চট্টগ্রামের জাতিগত বা জাতিসত্তাগত স্বাতন্ত্র্যের দিকটি বিবেচনায় নিলে সিরাজ সিকদারের সর্বহারা পার্টির জাতি বা জাতিসত্তাসমূহের জনগণের স্বাতন্ত্রের বা স্বাধিকার তথা স্বায়ত্তশাসনের অধিকারের বিষয়টি নিয়ে আমরা আরো বেশি কিছু বলতে পারি।
তবে প্রসঙ্গটির বিষয়বস্তু ব্যাপক বিস্তৃতি হবে বিধায় আমরা সেদিকে আলোকপাত করছি না।
পার্বত্য চট্টগ্রামের আন্দোলনকামী সংগঠন বিষয়ে সর্বহারা পার্টি
এ বিষয়ে শুধুমাত্র একটি দলিল আমরা পাই। দলিলের শিরোনামা- ‘পার্বত্য চট্টগ্রামের সংকীর্ণ জাতীয়তাবাদীদের প্রতিক্রিয়াশীল কার্যকলাপ’। ১৯৭৪ সালের সেপ্টেম্বর মাসে স্ফুলিঙ্গ নামক প্রকাশনায় লেখাটি প্রকাশিত হয়। এতে জনসংহতি সমিতি বা জেএসএস’র আন্দোলনকে ‘চাকমাদের আন্দোলন’ বলে অবস্থান তুলে ধরা হয়। লেখাটির প্রথমেই বলা হয়েছে-
সামন্ত ক্ষুদে বুর্জোয়াদের নেতৃত্বে চট্টগ্রামের চাকমা জাতিসত্তার মধ্যে একটি সংকীর্ণ জাতীয়তাবাদী আন্দোলন চলে আসছে। তারা শোষক ও শোষিত বাঙালীদের মধ্যে কোন পার্থক্য রেখা টানে না, সকল বাঙালীকেই শত্রু মনে করে।(সিরাজ সিকদার রচনা সংগ্রহ; পৃঃ ৬০৩)
এছাড়া এই সংকীর্ণ জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের নেতৃত্বদানকারী চাকমা জাতিগোষ্ঠী অন্যান্য জাতিসত্তার প্রতি নির্যাতনমূলক পদক্ষেপ গ্রহণ করে বলে বক্তব্য দেয়া হয়। লেখা হয়েছে-
‘তারা পার্বত্য চট্টগ্রামের বিভিন্ন জাতিসত্তার জন্য স্বায়ত্তশাসনের প্রতিশ্রুতি না দিয়ে পার্বত্য চট্টগ্রামের স্বায়ত্তশাসন, কখনো কখনো বিচ্ছিন্নতা দাবি করে।
এ দাবির অর্থ হচ্ছে কিছুটা ক্ষুদে বুর্জোয়া আলোকপ্রাপ্ত সংখ্যাধিক চাকমা জাতিসত্তার ক্ষমতা দখল এবং অন্যান্য জাতিসত্তার উপর তাদের কর্তৃত্ব ও নিপীড়ন।’(সূত্রঃ সিরাজ সিকদার রচনা সংগ্রহ; পৃঃ ৬০৩)
উক্ত দলিলে দেখা যায় কমিউনিস্ট পার্টি জাতি সম্পর্কিত দৃষ্টিভঙ্গির অন্যতম উপাদান বা যা সর্বহারার পার্টির নিউক্লিয়াস পূর্ব বাংলার শ্রমিক আন্দোলন ঘোষনা দিয়েছে, সেই ‘বিচ্ছিন্ন হবার অধিকারসহ বিভিন্ন সংখ্যালঘু জাতিকে স্বায়ত্তশাসন’ প্রদানের কথা উল্লেখ নেই। তার বিপরীতে লেখা রয়েছে-
‘পূর্ব বাংলার সর্বহারা পার্টি নিপীড়িত বাঙালী-পাহাড়ীদের ঐক্যের পক্ষপাতি এবং পাহাড়ী-বাঙালীদের সমঅধিকার, পাহাড়ী জাতিসত্তাসমূহের প্রত্যেকের জন্য স্বায়ত্তশাসনের পক্ষপাতী।’(সূত্রঃ সিরাজ সিকদার রচনা সংগ্রহ)
উক্ত দলিলে বলা হয়, পার্বত্য চট্টগ্রামে শান্তিবাহিনী বা জনসংহতি সমিতি দুর্বল হচ্ছে বা জনভিত্তি হারাচ্ছে এবং সর্বহারা পার্টি শক্তিশালী হচ্ছে।
সর্বহারা পার্টি বিষয়ে জেএসএস বা শান্তিবাহিনীর দৃষ্টিভঙ্গি
পার্বত্য চট্টগ্রামে সশস্ত সংগ্রামের কাল ১৯৭৬ থেকে ১৯৯৭ সাল পর্যন্ত বলা যায়। এই সময়ের প্রথমদিকে উক্ত অঞ্চলে সর্বহারা পার্টিও সক্রিয় ছিল। তাদের মধ্যে সংঘাত সংঘর্ষ হয়েছে। এবং এ বিষয়ে উপরে উল্লিখিত দলিলে বক্তব্যও দেয়া হয়েছে। এসব বিষয়ে বিস্তারিত না গিয়ে শান্তিবাহিনী বা জেএসএস সর্বহারা পার্টি বিষয়ে কী মত পোষণ করতো তা নিয়ে কিছু উল্লেখ করা প্রয়োজন। তবে এক্ষেত্রে জেএসএস আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো দলিল আকারে লেখা প্রকাশ করেনি। অন্তত এ পর্যন্ত সেরকম দলিল আমরা পাইনি। তবে বিভিন্ন প্রকাশনায় বা বইয়ে ব্যক্তিগতভাবে শান্তিবাহিনী বা জেএসএস সদস্যদের বক্তব্য আমরা পাই
সর্বহারা পার্টি বিষয়ে তাতিন্দ্রলাল চাকমা প্রকাশ মেজর পেলে জানাচ্ছেন-
“১৯৭৪ সালের এপ্রিল অথবা মে মাসের ঘটনা। স্থানটির নাম নাহক্য, গবমারা। এটা রাঙামাটি জেলার রাজস্থলী থানার একটি গ্রাম। আমার গেরিলা জীবনের প্রথম অপারেশন। ….। খবর পেলাম পূর্ববাংলা সর্বহারা পার্টি নিয়ন্ত্রিতি একটি সশস্ত্র গেরিলা গ্রুপের অবস্থান। জানতে পারলাম পূর্ববাংলা সর্বহারা পার্টির এই গ্রুপে সাতজন গেরিলা আছে এবং তারা সবাই অস্ত্রধারী।হালকা ভারী সব অস্ত্রই আছে তাদের কাছে।…।সর্বহারা পার্টির জোন কমান্ডার লগ্ন কুমার তঞ্চঙ্গ্যা রয়েছেন নেতৃত্বে।
এরা নানাভাবে আমাদের সংগ্রামে বাধা সৃষ্টি করছিল। স্বাধীনতার পর থেকেই এদেরকে মোকাবেলা করতে হচ্ছিল আমাদের। (বোল্ড করা হল)সিদ্ধান্ত হল সর্বহারার এই গ্রুপটির গোপন আস্তানায় গিয়ে আকস্মিকভাবে আক্রমণ করবো।”(সূত্রঃ শান্তিবাহিনীঃ গেরিলা জীবন, গোলাম মোর্তোজা, সময় প্রকাশন, পৃঃ৬৩)
এছাড়া আরেকজন গুরুত্বপূর্ণ জেএসএস সদস্য স্নেহ কুমার চাকমা সর্বহারা পার্টি বিষয়ে না হলেও পূর্ব বাংলার কমিউনিস্ট পার্টির একজন সদস্যের সাথে দেখা হবার পরে পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ে উক্ত ব্যক্তির মতামত জেনে এ বিষয়ে যে মন্তব্য করেন তা এখানে বলা দরকার। তিনি লিখছেন-
পার্টি জীবনে যে কয়েকজন বাঙালী মুসলমান বামপন্থী রাজনৈতিক কর্মীর সহিত আমার ঘটনাক্রমে দেখা হয়েছিল তারা সকলেই পার্বত্য চট্টগ্রামে ভুমি বেদখলকারী বাঙ্গালী মুসলমানদেরকে পার্বত্য চট্টগ্রামে রাখার পক্ষে মত প্রকাশ করতেন। তাই মনে করি মুসলমান বাঙ্গালী কম্যুনিস্টরা তাদের জাতীয় স্বার্থে সম্প্রসারণ নীতিকে লালন করে কম্যুনিস্ট রাজনীতির চর্চা করেন। তাই করেন বলে পার্বত্য চট্টগ্রামের প্রান্তিক পর্যায়ে পড়া জুম্মদের অস্তিত্ব রক্ষার কথা চিন্তা করেন না, বলেন না।’(সূত্রঃ জীবনালেখ্য, জীবন, সংগ্রাম ও সংঘাতময় দিনগুলির কথা, স্নেহ কুমার চাকমা, আগস্ট, ২০১১; পৃঃ ১৮৫)
এখানে আমি মাত্র এই দুইজনের উদ্ধৃতি যোগ করলাম। পরে আরো কোনো জেএসএস সদস্য বা জেএসএস’র সাংগঠনিক বক্তব্য প্রকাশিত হলে নিশ্চয়ই তা যোগ করার আশা থাকলো। তবে এই দুই বক্তব্যের মাধ্যমে পার্বত্য চট্টগ্রামে সশস্ত্র সংগ্রাম চলাকালীন সর্বহারা পার্টি বা দেশের অন্য কমিউনিস্ট পার্টি বিষয়ে জেএসএস বা জেএসএস সদস্যদের মনোভাব প্রকাশ হয়েছে বলে মনে করা যায়।
এতে দেখা যায়, পার্বত্য চট্টগ্রামের সচেতন রাজনৈতিক অংশ বা যারা তৎকালীন সময়ে জনসংহতি সমিতি বা শান্তিবাহিনী গঠন করে লড়াই করে যাচ্ছিল তারা দেশের বৃহত্তর জাতি বা জাতিসত্তার প্রতিনিধিত্বকারী পার্টিকে বিশ্বাস স্থাপন করতে পারেনি বা বিশ্বাস করেনি।
এখানে বলা দরকার পূর্ব বাংলার শ্রমিক আন্দোলনের থিসিসের সাধারণ কর্মনীতি অংশের দশ নম্বর ধারায় লেখা হয়েছে- ‘সকল অবাঙালী(গুরুত্বপ্রদানের জন্য বোল্ড করা হল)দেশপ্রেমিক জনগণের সাংস্কৃতিক ও ভাষাগত বিকাশের পূর্ণ সুযোগ দেয়া হবে।’ এই ‘অবাঙালী’ শব্দবন্ধ ব্যবহারের মাধ্যমেই বোঝা যায়, সর্বহারা পার্টি আন্তর্জাতিকতাবাদী দৃষ্টিভঙ্গি ধারণ করার কথা বললেও আদতে ‘বাঙালী জাতীয়তাবাদ’ থেকে এই দলটি উপরে উঠতে পারেনি।
কমিউনিস্ট আন্দোলনে জাতি বা জাতিসত্তার অধিকারের প্রশ্ন
এই বিষয়বস্তু নিয়ে মার্ক্স, লেনিন, স্তালিন, মাও সেতুং থেকে শুরু করে কমিউনিস্ট বিপ্লবীদের অনেকেই লিখেছেন।সুতরাং আমি এ বিষয়ে বিস্তারিত যাচ্ছি না।
বাংলাদেশের পাশের দেশ বার্মা বা মায়ানমার বা মিয়ানমার। এই দেশটির কমিউনিস্ট আন্দোলন বিষয়ে আমাদের সচেতন মহলে তেমন ধারনা নেই। এছাড়া এই আন্দোলন বিষয়ে এমনকি বার্মা বিষয়েও আমাদের দেশে তেমন বইপত্র পাওয়া যায় না। কিন্তু বার্মা কমিউনিস্ট পার্টি বিষয়ে সম্ভবত আমাদের দেশের কমিউনিস্ট নামে পরিচিত বিপ্লবী পার্টি-সংগঠন ও ব্যক্তির ধারনা থাকা দরকার বলে মনেকরি।
একসময় বার্মায় কমিউনিস্ট পার্টি অব বার্মা বা বিসিপি/সিপিবি খুব শক্তিশালী সংগঠন ছিল। এই সংগঠন সশস্ত্র সংগ্রামও করেছে। কিন্তু ১৮৮৯ সালের দিকে এই সংগঠন দুর্বল হয়ে যায় এবং একঅর্থে তাদের অস্তিত্ব নিভু নিভু হয়ে যায়, যদিও এখনো তা নেভেনি।
এই পার্টি একসময় সারা বার্মায় ছড়িয়ে ছিল। পরে তারা বার্মার শান রাজ্যের দিকে পশ্চাদ্ভাবন করে। সেখানে তারা চীনা কমিউনিস্ট পার্টির সহায়তায় বার্মার মধ্যে চীন বা হান জাতিসত্তার জনগণের মাঝে তাদের সংগঠনের ভিত সুদৃঢ় করে। কিন্তু ১৮৮৯ সালের দিকে হান জাতি বা সেখানে কোকাং নামে পরিচিত জনগণের কমিউনিস্ট যুবনেতৃত্ব পুরাতন বা বয়স্ক এবং বার্মা জাতিভুক্ত নেতৃত্বকে তাদের অঞ্চল থেকে হটিয়ে দেয়। বার্মা কমিউনিস্ট পার্টির নেতৃবৃন্দ চীনে পালিয়ে যান। এই ধরনের অভ্যন্তরীণ ক্যুদেতা বা ক্ষমতা দখল কেন হলো। এ বিষয়ে তেমন জানা না না গেলেও এটা বলা যায় যে, মূলত জাতি বা জাতিসত্তার আন্দোলন বিষয়ে ভুল দৃষ্টিভঙ্গি গ্রহনের জন্যই একসময়ের শক্তিশালী এই সংগঠন দুর্বল হয়ে যায়। Bertil Lintner নামে সুইডিশ লেখক The Rise and Fall of The Communist Party of Burma নামে একটি বই লেখেন। ১৯৮৬ সালের অক্টোবর থেকে ১৯৮৭ সালের এপ্রিল পর্যন্ত তিনি বার্মা কমিউনিস্ট পার্টি নিয়ন্ত্রিত অঞ্চলে অবস্থান করে নেতৃবৃন্দের সাক্ষাতকার নিয়ে উক্ত বইটি প্রকাশ করেন। উক্ত বই নিয়ে বার্মা সংশ্লিষ্ট একটি ওয়েবসাইটে যে রিভিউ করা হয় তাতে লেখক বইয়ে যে মূল্যায়ন করেন তার দুই লাইনে তুলে ধরেন। তাতে লেখা রয়েছে-
তিনি লিখেছেন, ‘উত্তরপূর্ব অঞ্চলের ঘাঁটি এলাকার জনগণের কাছে কমিউনিস্ট মতাদর্শ ফাঁপা বুলি বা ধারণা হয়ে গেল জনগণের কাছে কোনো অর্থ বহন না করায় বা বস্তুগত কিছু বোধগম্য প্রমাণিত না হওয়ায়।’(Communist ideology became a hollow concept without any real meaning to the people in the northeastern base areas,” he writes.)।
‘বার্মা কমিউনিস্ট পার্টির জন্য এটি একটি তাৎপর্যপূর্ণ শিক্ষা যে,দলটি বিদ্রোহের মুখে পড়েছিল কারণ তারা মতাদর্শকে উপরে স্থান দিয়েছিল এলাকার জাতিসত্তাসমূহের অধিকার প্রদানের চেয়ে।’(“It would be an important history lesson for the CPB that it faced mutiny because they had prioritized their ideology rather than ethnic rights (in the region).”)
লেখকের বক্তব্যকে হুবহু আমলে না নিয়েও এটা বলা যায়, তত্ত্ব ও প্রয়োগের মধ্যে সংযোগ সাধন করতে না পারায় এবং জাতিসত্তার জনগণকে কমিউনিস্ট মতাদর্শে উদ্বুদ্ধ করতে না পারায় এতবড় একটি পার্টি পরে তার সকল শক্তি হারিয়ে ফেলে।
এই একই কথা পূর্ব বাংলার সর্বহারা পার্টির ক্ষেত্রেও যে অসত্য তা বলা যাবে না।
এখানে প্রসঙ্গক্রমে চীনে মাও সেতুঙের নেতৃত্বাধীন কমিউনিস্ট পার্টি ঐতিহাসিক লংমার্চের সময় বিভিন্ন জাতি বা জাতিসত্তার জনগণ অধ্যুষিত জনগণের বিরাট বিরাট এলাকা অতিক্রম করার সময় সে সকল স্থানে অবস্থানকারী জাতি বা জাতিসত্তার জনগণের ব্যাপক প্রতিরোধ ও হামলার মুখোমুখি হয়েছিল। কিন্তু চীনা কমিউনিস্ট পার্টি সে অঞ্চেলের জাতি বা জাতিসত্তার বিরুদ্ধে কোনো বিরুদ্ধ পদক্ষেপ না নিয়ে ধৈর্য ধরে পরিস্থিতির মোকাবেলা করেছিল এবং পরে চীনের এই সকল জাতি বা জাতিসত্তার জনগণ চীনা কমিউনিস্ট পার্টিকে সর্বতোভাবে সহায়তা করেছিল এমনকি হয়তো গুরুত্বপূর্ণ ভুমিকাও তারা পালন করতে সক্ষম হয়েছিল।
কিন্তু বাংলাদেশে পূর্ব বাংলার সর্বহারা পার্টি থেকে শুরু করে কমিউনিস্ট নামে পরিচিত বিভিন্ন সংগঠন পার্টি জাতি বা জাতিসত্তার অধিকার নিয়ে যেমন সঠিক অবস্থান নেয়নি তেমনি বৃহত্তর প্রেক্ষিতে নিশ্চয়িই আরো অনেক গুরুতর ভ্রান্তির মধ্যে পড়েছিল বলে আজ দেশে কমিউনিস্ট আন্দোলন যে মাত্রা ও গুরুত্ব নিয়ে জনগণের কাছে হাজির হবার কথা তার অনুপস্থিতি আমরা লক্ষ্য করি। এ বিষয়ে গভীর অনুসন্ধান ও বিশ্লেষণ আরো হওয়া প্রয়োজন।
কৈফিয়ত: এখানে যে বক্তব্য উপস্থাপন করা হয়েছে তা নিয়ে আরো অন্য দৃষ্টিভঙ্গি বা ভিন্ন বক্তব্য থাকতে পারে।এ বিষয়ে আলোচনা হলে খুশি হব।

Thursday, January 14, 2016

এম এন লারমা স্মরণেঃ জয় আমাদের হবেই-হবে

তারিখঃ ১৫ সেপ্টেম্বর, ২০১৫
এম এন লারমা, কারো কাছে তিনি পরিচিত লিডার, তার ভাই-বোনের কাছে তিনি মঞ্জু নামে পরিচিত, জুম্ম জনগনের প্রায় সকলের কাছে তিনি 'অবিসিংবাদিত নেতা, কারো কাছে 'আমাদের নেতা, পার্টি নামে তিনি পরিচিত 'প্রবাহন'।
তাঁর পুরো মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমা।
আজ ১৫ সেপ্টেম্বর পার্বত্য চট্টগ্রামের সেই মৃত্যুঞ্জয়ী শহীদ নেতা মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমা'র ৭৬তম জন্মদুন। ১৯৩৯ সালের এই দিন তিনি রাঙামাটির 'মাওরুম' নামে ছোট্ট নদীর/ছড়ার তীরে মাওরুম গ্রামে জন্মেছিলেন।
তাকে নিয়ে অনেকেই আজ লিখবেন, বলবেন, আবেগাক্রান্ত হবেন; হয়তো তারপরও দেশের 'মূলধারা'র মিডিয়া-নিপীড়িত জনতার কণ্ঠ থেকে শতাংশের তুচ্ছভাগ তাকে তর্পণ করবে অথবা তাও হয়তো করবে না।
কিন্তু আমরা জানি, বাংলাদেশের ইতিহাসে দেশের আইনপ্রণয়ননের যে ভবন রয়েছে সেই ভবনের ভেতরে গিয়ে গোটা দেশের জনমানুষের অভাব অভিব্যক্তির কথা একমাত্র তিনিই ধারণ করেছিলেন, আর সকলে ছিলো তাদের নিজ নিজ দলেরই সেবাদাস।
এম এন লারমা সংসদে দাঁড়িয়ে সেই বাহাত্তর সালে বলেছিলেন, '... আমার বিবেক, আমার মনের অভিব্যাক্তি বলছে, বাংলাদেশের সাড়ে সাত কোটি মানুষের মনের কথা এই খসড়া সংবিধানে নেই'। তিনিই সংসদে বসে হুঁশিয়ারী দিয়ে বলেছিলেন, '... আজ যদি তাড়াহুড়ো করে এই সংবিধান পাশ করতে যাই, তাহলে এর মধ্যে ভুল-ত্রুটি থেকে যেতে পারে এবং সেই ভুল-ত্রুটি আমরা পরে সহজে সংশোধন করতে পারবো না। তা ফলে অনেক অসুবিধায় পড়তে হবে'। তিনি সংবিধানকে জনমানুষের কাছে নিয়ে যাবার জন্য সংসদে অনুরোধ করে বলেছিলেন, 'জনমত যাচাইয়ের জন্য এই বিল প্রচার করা হোক'।
আওমীলীগের জাতীয়তাবাদী সমাজতন্ত্রকে তিনিই প্রথম সংসদে দাঁড়িয়ে প্রশ্ন করে বলেছিলেন, '... এই সংবিধানের মাধ্যমে আমরা যে সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করতে যাচ্ছি সেই সমাজতন্ত্রের নামে আমরা যদি উচ্চ শ্রেণীর দুর্নীতিবাজ, ঘুষখোর ও সেই ক্ষমতা অপব্যবহারকারীদে
রই আবার দেখতে পাই তাহলে ভবিষ্যতের নাগরিক, যারা আমাদের ভবিষ্যত বংশধর, তারা আমাদের বলবে যে, যারা এই সংবিধান প্রণয়ন করে গিয়েছেন, তারা ক্ষমতায় মদমত্ত হয়ে জনগনের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করেছেন.. '।
জাতীয় সংসদে বসে তিনিই প্রথম 'সাম্রাজ্যবাদ' শব্দটি ব্যবহার করে সাম্রাজ্যবাদের বিরোধিতা করেছিলেন।
১৯৭৪ সালের ৫ জুলাই সংসদে বাজেট আলোচনায় তিনি বলেছিলেন, "... মাননীয় স্পীকার সাহেব, সুতরাং সরকার জেনেশুনে এক শ্রেণীর মানুষকে ধনী করার পথ প্রশস্ত করেছেন। এটা সরকারের পক্ষে অশুভ লক্ষণ"।
তিনি ১৯৭৪ সালের ১৭ জানুয়ারি রাষ্ট্রপতির ভাষনের উপর ধন্যবাদ প্রস্তাব বিষয়ে আলোচনার সময় সংসদে উঠে দাঁড়িয়ে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার চেয়ে বলেছিলেন, "কিন্তু দুঃখের বিষয়, পাকিস্তানের হানাদার বাহিনী ভারতীয় সেনাবাহিনীর যৌথ কমান্ডের নিকট আত্মসমর্পণ করে আজো সেই হানাদারকে যুদ্ধাপরাধী হিসেবে বাংলাদেশের মাটিতে বিচার করা হয়নি,... "

কিন্তু তার এই জাতীয় ভুমিকাকে কি এই দেশের সংকীর্ণ জাত্যাভিমানে মত্তগণ স্বীকার করেন???
আমরা কি আশা করতে পারি না যে, তিনি মূলধারার জনমানুষের প্রতিনিধিত্বকারী হিসেবেও সবার কাছে পরিচিত হবেন?
তিনি ১৯৮৩ সালের ১০ নভেম্বর তিনি নিজ দলেরই বিভ্রান্ত-বিভেদকারী কয়েকজনের হাতে খুন হন।
তিনি তাঁর শেষ ডায়েরি'র পাতা'র প্রথম পাতাটিতে লিখেছিলেন, "মহান জুম্ম জনগণের আন্দোলন দীর্ঘজীবী হোক, সারা দুনিয়ার নিপীড়িত জনতা এক হও। জয় আমাদের হবেই হবে"।
আজ, এবং আজও সেই বিজয়ের আশা নিয়ে আমরা লড়াইয়ে আছি, অতন্দ্র প্রহরী!
সত্যিই কি তা-ই???

Wednesday, December 30, 2015

আধুনিক সিঙ্গাপুরের স্থপতি লি কুয়ান ইউ’র নেতৃত্বের ধরণ



সিঙ্গাপুর নামক রাষ্ট্রটি ক্ষুদ্র দ্বীপখন্ড বা দ্বীপখন্ডসমূহের সমষ্টি। প্রায় ৫৫ লাখ জনঅধ্যুষিত এই রাষ্ট্রটি বিশ্বের আর ২০০টি রাষ্ট্রেরই মতো একটি রাষ্ট্র। ১৯৬৫ সালের ০৯ আগস্ট এই রাষ্ট্রটি মালয় ফেডারেশন থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে। স্বাধীনতা ঘোষনার সময় এই রাষ্ট্রটি বলতে গেলে একটি জেলে পল্লী মাত্র ছিল। লি কুয়ান ইউ তখন ছিলেন সেই জেলেপল্লীসম দ্বীপখন্ড বা দ্বীপখন্ডসমূহের ২০ লাখ মানুষের নেতা তথা প্রধানমন্ত্রী। তার নেতৃত্বে সেই রাষ্ট্রটি মাত্র কয়েকবছরের মধ্যে উন্নতশীল ও বর্তমানে উন্নত রাষ্ট্রের কাতারে চলে আসে।সিঙ্গাপুরকে তিনি যেমন ন্যায়সংগত শাসন ব্যবস্থার মাধ্যমে পুঁজিবাদী বৈশিষ্ট্যসম্পন্ন জনকল্যাণমূলক রাষ্ট্র হিসেবে দাঁড় করান তেমনি তিনিও পরিচিতি লাভ করেন বিশ্বের মাঝে শক্তিশালী একজন রাষ্ট্রনায়ক তথা সরকার পরিচালক হিসেবে।
তাঁর সরকার পরিচালনার ধরণ বা তাঁর নেতৃত্বের বৈশিষ্ট্য বা নেতৃত্বের ধরণ নিয়েই এই আলোচনা। এই আলোচনার মাধ্যমে আমরাও যদি কিছুটা শিক্ষা অর্জন করতে পারি তবে নিশ্চয়ই এই প্রচেষ্টা সার্থক হবে বলে আশা।
এখানে আমি মানিক মোহাম্মদ রাজ্জাক কর্তৃক ভাষান্তরকৃত লি কুয়ান ইউ’র আত্মকথা ‘ফ্রম থার্ড ওয়ার্ল্ড টু ফাস্ট ফাস্ট; সিঙ্গাপুরের ইতিহাসঃ ১৯৬৫-২০০০’ বই থেকে লেখার সারবস্তুসমূহ সংগ্রহ করেছি এবং তথ্যসহ উদ্ধৃতিসমূহও এই বই থেকেই গ্রহণ করা হয়েছে।

বয়োকনিষ্ঠ নেতা থেকে সুযোগ্য রাষ্ট্র পরিচালক
লি কুয়ান ইউ যখন সিঙ্গাপুর রাষ্ট্রের দায়িত্বভার গ্রহণ করেন তখন তার সাথে থাকা সহযোগীদের চেয়ে বয়সে কনিষ্ঠ ছিলেন।
তিনি ১৯৫৯ সালের দিকে মাত্র ৩৫ বছর বয়সে স্বায়ত্তশাসিত সিঙ্গাপুরের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেছিলেন। ১৯৬৫ সালে যখন সিঙ্গাপুর মালয় ফেডারেশন থেকে স্বাধীন হয় তখন তার বয়স ছিল ৪২ বছর। তিনি ছিলেন তার সহকর্মীদের মধ্যে সবচেয়ে কম বয়সী। দায়িত্ব গ্রহণ বিষয়ে তিনি লিখেছেন স্মৃতি কথায় লিখেছেন- ‘আমি তাঁদের সকলের চেয়ে বয়সে কনিষ্ঠ ছিলাম। তারপরেও তাঁরা কখনো আমার  কোনো বিষয়ে বাধা দেননি, নিজেদের  সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দেননি। এমনকি আমি যখন কোনো ভুল করেছি তখনও তাঁরা আমার বিরোধিতা করেননি। তাঁরা সবসময় আমাকে ভারসাম্যপূর্ণ ‍অবস্থানে অবস্থান করতে সহায়তা করেছেন এবং আমার ভেতরে যেন ‘মুই কি হনু রে’ জাতীয় ঝুঁকিপূর্ণ আত্মম্ভরিতার বিকাশ না ঘটে সে বিষয়ে সচেতন থেকেছেন।’(পৃ:২৯৪)
তিনি সরকার পরিচালনার ক্ষেত্রে যে বিষয়গুলোর উপর গুরুত্ব আরোপ করেছেন তার কিছু কিছু আমি নিচে তুলে ধরার চেষ্টা করছি।


সুশাসনের জন্য সুনেতৃত্ব অত্যাবশ্যক
তিনি সরকার বা রাষ্ট্র বা প্রতিষ্ঠান পরিচালনার ক্ষেত্রে একই সাথে ভালো লোক ও সুনেতৃত্বের উপর জোর দিয়েছেন। তিনি বলছেন- ‘আমি দেখেছি, সুগঠিত সরকার কাঠামোও যদি মন্দ লোকের দ্বারা পরিচালিত হয় তাতে করেও জনগণের ক্ষতিই সাধিত হয়। অন্যদিকে আমি অনেক সমাজে সরকারের কাঠামোগত দুর্বলতা সত্ত্বেও সুনেতৃত্বের বদান্যতায় সুশাসন প্রতিষ্ঠা হতে দেখেছি।’
এদিক থেকে তিনি ভালো একজন প্রশাসক ও সুনেতা অবশ্যই ছিলেন। প্রশাসন পরিচালনার সময় তিনি যেমন দুর্নীতি স্বজনপ্রীতি করেননি তেমনি তার প্রশাসন বা সরকারে যেন সে ধরণের কিছু চলতে না পারে সে ব্যবস্থা তিনি করার চেষ্টা করেছেন। এক্ষেত্রে তাকে আপাতভাবে নানা ‘বিতর্কিত’ সিদ্ধান্তও অনেক ক্ষেত্রে নিতে হয়েছে।
তিনি বলছেন- ‘… আমাদের মন্ত্রীপরিষদের  সকলেই বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিগ্রিধারী ছিলাম। অফিসের বাইরে আমাদের কোনো বৃত্তিগ্রহণের প্রয়োজন হয়নি। আমাদের সকলের স্ত্রী উপার্জন করতেন, আমরা জেলে গেলে কাছাকাছি না থাকলে তাঁদের অর্থেই সংসারের খরচাপাতি মেটানো হত। এভাবেই আমাদের মন্ত্রী এবং তাঁদের স্ত্রীদের মানসিক গঠন গড়ে উঠেছিল। এ ধরণের পরিবেশে মন্ত্রীগণ যখন জনতার প্রতি আস্থাশীল থেকে তাদের প্রতি সম্মান প্রদর্শন করত তখন আমলারাও নির্ভীক চিত্তে মাথা উঁচু করে আস্থার সাথে সিদ্ধান্ত প্রদান করতেন।’(পৃঃ১৯৭)
তাঁর এবং তাঁর সহকর্মীদের এই ক্লিন ইমেজের কারণে তারা জনগণের মাঝে নিজেদের গ্রহণযোগ্যতা সৃষ্টি করতে পেরেছিলেন।
তিনি মন্ত্রীদের বেতন বাড়িয়ে দিয়েছিলেন। এছাড়া একনাগারে যারা ১০ বছরের মতো সংসদ সদস্য থাকতেন তাদের জন্য তনি পেনশনের  ব্যবস্থা করেছিলেন।
একইসাথে তিনি দেখেছেন, সাধারণভাবে নির্বাচনে বিজয়ী হতে প্রার্থীদের বিস্তর খরচ করতে হত। এতে তারা নির্বাচিত হবার পরে সেই অর্থ আবার তুলে আনতে নানা ধরণের অনিয়মে জড়িত হতেন।
তিনি বলছেন- ‘বিশুদ্ধ সরকারের একটি অপরিহার্য শর্তই হচ্ছে নির্বাচনে অধিক ব্যয় না করা, কারণ ব্যয়িত অর্থ পুনরূদ্ধারের জন্য দুর্নীতির চক্রে আবর্তিত হতে হয়। এশিয়ার অধিকাংশ দেশের ধ্বংসের মূলে রয়েছে নির্বাচনে বেপরোয়া ব্যয়।’(পৃঃ ২০৩)
তিনি বলছেন- ‘নির্বাচনে অনাহুত ব্যয় করে কোনো সরকারই সততা রক্ষা করতে পারে না, এক্ষেত্রে সিঙ্গাপুর একটি পরিচ্ছন্ন পদ্ধতি প্রবর্তন করে সততার নজির স্থাপন করেছে।’(পৃঃ২০৩)


সঠিক ব্যক্তিকে সঠিক দায়িত্ব সমর্পন
প্রশাসন বা সরকার বা প্রতিষ্ঠান পরিচালনার ক্ষেত্রে সঠিক বা দক্ষ যোগ্য ব্যক্তিকে সঠিক দায়িত্ব প্রদান করা সম্ভব হলে সকল কাজ সুষ্ঠুভাবে সম্পাদিত হয়। তিনি এই দৃষ্টিভঙ্গিকে তাঁর নেতৃত্বের ক্ষেত্রে ব্যবহার করেছেন। তিনি বলছেন- ‘যখনই আমি সঠিক ব্যক্তিকে কোনো দায়িত্বে ন্যস্ত করতাম তখনেই আমার ঘাড় থেকে একটি বোঝা নেমে যেত। আমি দায়িত্ব অর্পণকারীদের শুধু বিষয়বস্তু এবং কতদিনের মধ্যে দায়িত্বপ্রাপ্ত কাজটি সম্পন্ন করতে হবে সে-সম্পর্কে পরিষ্কার ধারণা প্রদান করতাম, কাজটি সম্পাদনের তরিকা তারাই উদ্ভাবন করে তা সম্পন্ন করতেন।’
এভাবে তিনি সতর্কতার সাথে তার সহকর্মীদের বিভিন্ন দায়িত্বে নিযুক্ত করতে দক্ষতা দেখিয়েছিলেন।কোন ব্যক্তি কী ধরণের দায়িত্ব পালন করতে পারবেন এ বিষয়ে সম্ভবত তাঁর সুচারু ধারণা বা জ্ঞান ছিল বলা যায়।

যোগ্য ব্যক্তিকে খুঁজে বের করা
লি কুয়ান ইউ তার এক সহকর্মী’র গুণবাবলী সম্পর্কে বলছেন- ‘আমার মন্ত্রীদের মধ্যে হোন সুই সেন উপযুক্ত লোকবল অনুসন্ধানের কাজে সবচেয়ে দক্ষ ছিলেন।’(পৃঃ ২৭৫)
তিনি গোহ চক তং-এর মতো একজন করিৎকর্মা নির্বাহীকে খুঁজে বের করেছিলেন। পরে গোহ চক তং প্রধানমন্ত্রী পদ অলংকৃত করেছিলেন।তিনি সুই সেন ও ডঃ তনি তান-এর মতো ব্যক্তিত্বকেও রাজনৈতিক কাজে সম্পৃক্ত করেছিলেন। এই দুইজন পরবর্তিতে উপপ্রধানমন্ত্রী পদে অধিষ্ঠিত হন।
এছাড়া সংযুক্ত করেছিলেন এস ধনবালানের মতো প্রজ্ঞাবানকেও। যিনি পরে সিঙ্গাপুর উন্নয়ন ব্যাংকসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পালন করেছিলেন।

নেতৃত্বের জন্য মেধার সাথে আরো যা কিছু প্রয়োজন
নেতৃত্ব প্রদানের জন্য মেধা অবশ্যই প্রয়োজন। তবে তার অতিরিক্ত আরো বেশি কিছুরও প্রয়োজন রয়েছে।
লি কুয়ান উই জানাচ্ছেন- ‘অচিরেই আমরা বুঝতে পেরেছিলাম যে নেতৃত্বের জন্য মেধার বাইরেও অনেক কিছুর আবশ্যকতা অপরিহার্য। একজন মেধাবি ব্যক্তি তার প্রজ্ঞা দিয়ে যত সহজে ঘটনাপ্রবাহের বিশ্লেষণ করতে পারে, যত সহজে একটি পিএইচডি থিসিস লিখতে পারে তত সহজভাবে গণনেতৃত্বে সফলতা অর্জন করতে পারে না। জনগণকে নেতৃত্ব দেয়ার জন্য আরো অনেক কিছু প্রয়োজন। এর জন্য প্রয়োজন সাহসিকতা, আত্মপ্রত্যয়, দায়বদ্ধতা, সুচরিত্র এবং সক্ষমতা।
যেসব গুণের কারণে জনগণ নেতার পদাঙ্ক অনুসরণে অনুপ্রাণিত হয় সেসব গুণের অধিকারী হওয়া একজন নেতার জন্য অতীব জরুরি। এজন্য আমাদের এমন লোকের প্রয়োজন ছিল যিনি রাজনৈতিক কর্মকান্ডে তৎপর, সুবিবেচক এবং মানুষের সাথে মেলামেশায় দক্ষ।’

মনস্তাত্ত্বিক সক্ষমতাও নেতৃত্বের জন্য অতীব প্রয়োজনীয় গুণাবলী
১৯৭০ সালে আমেরিকার মহাকাশযান এপোলো-১৩ মহাকাশে যায়।এই ঘটনাপ্রবাহ তখন টেলিভিশনে দেখানো হচ্ছিল। লি কুয়ান ইউ তা দেখছিলেন। তিনি দেখলেন, পৃথিবী থেকে তিন লক্ষ মাইল দূরে থাকা মহাকাশযানটি কার্যকরভাবে কাজ করছিলো না। নভোচারীদের একজন সামান্য ভুল করেছিল এবং এতে সকলে বিপদের মধ্যে পড়ে। কিন্তু মহাকাশযানে থাকা সবাই একটুও বিচলিত না হয়ে পৃথিবীর নিয়ন্ত্রণকক্ষের নির্দেশনা অত্যন্ত ঠান্ডা মাথায় পালন করে যাচ্ছিল। শেষে তারা বিপর্যয়ের কবল থেকে রক্ষা পায়। মহাকাশে প্রেরণের আগে আমেরিকার মহাকাশ সংস্থা নাসা নভোচরাদিদের মনস্তাত্ত্বিক সক্ষমতারও পরীক্ষা গ্রহণ করতো।

লি কুয়ান ইউ এই ঘটনা থেকে শিক্ষা নিয়ে তার সরকারে যারা নিযুক্ত হতেন তাদের তিনি মনস্তাত্ত্বিক সক্ষমতার পরীক্ষার ব্যবস্থা করতেন। তিনি লিখেছেন- এ ঘটনা পর্যবেক্ষণের পর আমি আমাদের সকল পর্যায়ের প্রার্থীদের মানসিক সক্ষমতা যাচাইয়ের জন্য মনোবিজ্ঞানী এবং মনোরোগ বিশেষজ্ঞ নিয়োগের ব্যবস্থা গ্রহণ করেছিলাম।

মনস্তাত্ত্বিক পরীক্ষায় চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য, বুদ্ধিমত্তা, মূল্যবোধ ও জীবনাচার ইত্যাদি সম্পর্কে প্রতিবেদন লেখা হতো। এছাড়া সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির বিশ্লেষণ ক্ষমতা, তার দূরদৃষ্টি ও বাস্তব-সম্পর্কিত জ্ঞান এই গুণাবলী বিষয়েও মনস্তাত্ত্বিক পরীক্ষায় পর্যবেক্ষণ করা হতো।

নতুন প্রজন্মের নেতৃত্ব গড়ে তোলার কাজ
১৯৭৪ সালে কোনো একদিন তিনি অর্থমন্ত্রী সুই সেন-এর সাথে আলাপ করছিলেন। সুই সেন তার কাছে আশংকা প্রকাশ করছেন যে, তাকে সম্ভবত আগামী সাধারণ নির্বাচনের পরে সরে দাঁড়াতে হতে পারে। কারণ তার বয়স বেড়ে যাচ্ছে। তখন পর্যন্ত সুই সেনের বয়স ছিল ৬৫ বছর। লি কুয়ান ইউ জানাচ্ছেন সুই সেনের সাথে সেদিনের আলোচনা তার উপর প্রচন্ড প্রভাব পড়েছিল। তারপর থেকে তিনি নেতৃত্বের উত্তরাধিকারী নির্বাচনের দিকে নজর দিতে থাকেন।

এরপর তিনি বলছেন- ‘আমাদের চূড়ান্ত কাজ ছিল শক্তিশালী উত্তরাধিকার গড়ে তোলা। মাও সেতুং এ সমস্যা উত্তরণের নিমিত্ত যোগ্য উত্তরাধিকার বিকাশের স্বার্থে সাংস্কৃতিক বিপ্লবের ছত্রছায়ায় লং মার্চের ডাক দিয়েছিলেন। আ্মাদের পক্ষ থেকে এমনটা করা সম্ভব ছিল না। সঠিক চরিত্রের নেতৃত্বের মাধ্যমে আমাদেরকে সমাধানের পথ খুঁজতে হয়েছিল, যারা সংকট মোকাবেলার মধ্য দিয়েই পরীক্ষিত নেতা হিসেবে বিকশিত হবে।’

তিনি বলছেন- ’আমাদের উদ্দেশ্য ছিল নেতৃত্বের উপর মানসিক চাপ সৃষ্টি না করে নতুন রক্তের সঞ্চালন করা। এ প্রক্রিয়াতে প্রতিষ্ঠাপন প্রাক্কালে আমার অনেক পুরাতন সহকর্মীকে নিজেদের পদ ছেড়ে সরে দাঁড়াতে হয়েছিল।’

তিনি নিজেকে তখন থেকেই ‘বয়স্কদের কাতারে ধাবিত’ হচ্ছিলেন বলে মন্তব্য করেছিলেন। তিনি বলছেন, নিজেকে প্রতিদিন আয়নাতে দেখে আমিও আমার অবস্থান বুঝতে পারতাম। আমাকে আমি আর আগের মতো সপ্রতিভ, ক্লান্তিহীন এবং উদ্দীপ্ত ভাবতে পারতাম না। তার চেয়েও বড় কথা, প্রকাশিত প্রতিবেদন, ছবি ও ভিডিও-র প্রতি আমি আস্থাশীল ছিলাম এবং বয়সের ব্যাপারটি বুঝতে পারতাম।

তবে এই সময়ে নতুন নেতৃত্ব গড়ে তোলার ধরণ বা কৌশল কী ধরণের হবে নিয়ে তিনি তার সহকর্মীদের কাছ থেকে নানা বাধা বিপত্তিরও সম্মুখীন হচ্ছিলেন। তার পুরাতন বয়স্ক সহকর্মীরা নতুনদের জায়গা ছেড়ে দেয়ার ক্ষেত্রে তারা যেভাবে ‘তৃণমূল পর্যায় থেকে রাজনৈতিক কর্মকান্ডের মাধ্যমে উঠে এসেছেন’ সেভাবেই তাদের উত্তরসূরীদের উঠে আসা দরকার বলে মনে করতেন।

কেউ কেউ মনে করতেন নতুনদের এত সহজভাবে গুরুত্বপূর্ণ পদে আসীন হতে দেয়াটা ঠিক হবে না, তাদের আরো শেখা উচিত ও অপেক্ষা করা উচিত।

কিন্তু লি কুয়ান ইউ ভিন্নমত পোষন করতেন এবং সেভাবে্ই তিনি সিঙ্গাপুর পরিচালনার জন্য পরবর্তী নেতৃত্বকে গড়ে তুলেছেন। দেশ থেকে ও বিদেশ থেকে উচ্চশিক্ষিত মেধাবীদের যোগ্যতার ভিত্তিতে তিনি নির্বাচিত করেছিলেন এবং তারা পার্টিতে যোগদানের তিন চার বছরের মাথায় গুরুত্বপূর্ণ পদে নিয়োগ করেছিলেন। তিনি বলছেন- ‘… আমি মনে করতাম নতুন জমানার মেধাবী ছেলেদের অপেক্ষা করবার মতো অবকাশ নেই, পার্টিতে রাখতে হলে ওদেরকে যথাযথ সুযোগ করে দিতে হবে, অন্যথায় ওরা ওদের পছন্দের পথে চলে যাবে।’

এভাবে তিনি সিঙ্গাপুরের যোগ্য উত্তরসূরী প্রশাসক নিয়োগের ক্ষেত্রে এক কথায় বলা যায় ঝুঁকি নিয়েছিলেন। তবে উত্তরাধিকার নিয়োগের ক্ষেত্রে তিনি যোগ্যতর নেতৃত্ব খুঁজতেও কড়া ধরণের পরীক্ষণ নিরীক্ষণের ব্যবস্থা গ্রহণ করেছিলেন।
রাষ্ট্রীয় বা সরকারী বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে লোকবল নিয়োগের ক্ষেত্রে ‘ধান্ধাবাজিতে অনভ্যস্ত মেধাবী, আন্তরিক, কর্মদক্ষ এবং গতিশীল তরুণ কর্মকর্তাদের উপর’ তিনি ও তাঁর সরকার আস্থা রেখেছিলেন।’(পৃঃ ১০৭)

তিনি আরো বলছেন- ‘… নবনিযুক্তদের জন্য রাজনৈতিক সচেতনতা এবং তৃণমূল পর্যায়ের জনগণের সাথে সম্পৃক্ততার গুণাগুণ অর্জন করাটা ছিল অত্যাবশ্যক। যাদের ভেতর এ সমস্ত অতিরিক্ত গুণাবলী পরিদৃষ্ট হত আমি শুধু তাদেরকেই মন্ত্রীসভায় স্থান করেদিতাম।’

তিনি নিজেও নতুনদের জন্য তার দায়িত্ব ছেড়ে দিয়েছিলেন। তিনি জানাচ্ছেন- ‘আমি ৩১ বছর প্রধানমন্ত্রী ছিলাম। ইচ্ছে করলে আরো এক টার্মের জন্য প্রধানমন্ত্রীত্বের পদে বহাল থাকতে পারতাম। কিন্তু তাতে আমার সক্ষমতা ও কার্যকারিতার প্রমাণ ব্যতিরেকে তেমন কিছুই অর্জিত হত না, অন্যদিকে দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি নিয়ে আমি যদি আমার উত্তরসূরিদের গড়ে তোলার ক্ষেত্রে সহায়তা করতে পারি তা হলে তা-ই হবে সিঙ্গাপুরের জন্য অধিকতর কল্যাণকর, এ ধরণের চিন্তাভাবনা থেকেই আমি আর প্রধানমন্ত্রীত্বের পদ ধরে রাখিনি।’
১৯৯০ সালে তিনি প্রধানমন্ত্রীত্বের পদ ছেড়েছিলেন।তবে তারপরও তিনি সরকার পরিচালনার ক্ষেত্রে পরোক্ষভাবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিলেন।

লি কুয়ান ইউ’র ন্যায়সংগত সমাজ গঠনের কাজ
লি কুয়ান ইউ জানাচ্ছেন যে, তারা সরকার পরিচালনার ক্ষেত্রে সমঅংশীদারিত্ব ভিত্তিক সমাজতান্ত্রিক একটি সমাজ গড়াতে বিশ্বাসী ছিলেন। কিন্তু অর্থনীতির বিকাশের জন্য ব্যক্তিগত উদ্যোগের বিকাশ ও প্রণোদনার প্রয়োজন ছিল। তবে তিনি বলছেন- ‘সকলের কর্মক্ষমতা এবং দক্ষতা সমান নয়, এক্ষেত্রে যদি কর্মদক্ষতার আলোকে বাজার ব্যবস্থার মাধ্যমে প্রাপ্যতা নির্ধারিত হয় তাহলে কেউবা অধিক লাভবান হবে, কেউ বা মাঝারী লাভবান হবে এবং ব্যাপক সংখ্যক লোক ক্ষতির সম্মুখীন হবে। এতে করে সামাজিক অস্থিতিশীলতা বৃদ্ধি পাবে এবং ন্যায়সংগত সমাজ প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ বাধাপ্রাপ্ত হবে।’(পৃঃ ১৩৫)

লি কুয়ান ইউ তাই রাষ্ট্রের অর্জিত সম্পদ সমভাবে বন্টনের ব্যবস্থা গ্রহণ করেন। তিনি বলেন- ‘আমরা যদি আমাদের অর্জিত সম্পদ ‍বিতরণে সমবন্টনের নীতি অনুসরণ না করতাম, তাহলে আমাদের জাতীয় সংহতির অনুভূতি দুর্বল হয়ে পড়ত এবং একটি সুনির্দিষ্ট অভীষ্টে চলার পথে হোঁচট খেত। আমি ব্যক্তি বিশেষের প্রতিযোগিতার ক্ষেত্রে গোষ্ঠী সংহতির স্বার্থে তাওইজমের প্রতীক তথা দুটি মাছের মাধ্যমে একটি চক্রসদৃশ সমাজিক বন্ধন গড়ে তুলেছিলাম। এর একটি মাছ ছিল পুরুষসদৃশ এবং অন্যটি নারী। এক্ষেত্রে পরুষ মাছটি যদি প্রতিযোগিতায় বিজয়ী হয়ে সকল কিছু অর্জন করে নিত, তা হলে সামাজিক সংহতি দুর্বল হয়ে যেত, যে কারণে ভারসাম্য তথা সামাজিক সংহতি রক্ষার্থে আমরা নারী মাছটির অনুকূলেও সম্পদের অংশবিশেষ বিতরণ করেছিলাম।’ (পৃঃ ১৪৭)
লি কুয়ান ইউ’র নেতৃত্বের ধরণ সম্পর্কে বিস্তারিত জানতে হলে তাঁর রাজনৈতিক জীবনী পাঠ করা প্রয়োজনীয়। তিনি কিভাবে সমস্যার মীমাংসা করেছিলেন, কিভাবে তিনি বাস্তব পরিকল্পনা করেছিলেন এবং বাস্তব সমস্যাসমূহ বাস্তবে বাস্তবিকভাবে একে একে সমাধান করতে পেরেছিলেন এ বিষয়গুলো তার লিখিত বই বা তাকে নিয়ে লেখা বই থেকে জানা সম্ভব হবে। যারা নেতৃত্ব দিতে চান বা যারা সমাজের জন্য কিছু একটা করতে চান তারা লি কুয়ান ইউ’র এই নেতৃত্বের ধরণ সম্পর্কে জানার চেষ্টা করবেন এই প্রত্যাশা থাকলো।

সর্বাধিক পঠিত

ইতিহাসের ভ্রান্তি থেকে বিভ্রান্তিকর শিক্ষাঃ পার্বত্য চট্টগ্রাম প্রসংগ-১৯৪৭ সাল

ইতিহাসের ভ্রান্তি থেকে বিভ্রান্তিকর শিক্ষা তারিখঃ ১৬ আগস্ট, ২০১৭ ইতিহাস একটি জাতি বা জাতিসত্তা তথা জাতিসমষ্টিকে নানাভাবে প্রভাবিত কর...