Showing posts with label ব্যক্তিত্ব. Show all posts
Showing posts with label ব্যক্তিত্ব. Show all posts

Wednesday, August 2, 2017

তাজউদ্দীন আহমদঃ নতুন আলোকে

সাদাসিধে তাজউদ্দীন আহমদ

তারিখঃ ২২ জুলাই, ২০১৭
তাঁর যখন ৪৫ বা ৪৬ বছর বয়স তখন তিনি দেশের স্বাধীনতা সংগ্রামে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন। তিনি ছিলেন একজন আদর্শ নেতা। তাঁর কন্যা শারমিন আহমদ যেমনটি বলেছিলেন, তাজউদ্দীন ছিলেন একজন দক্ষ সংগঠক, দূরদর্শী চিন্তার অধিকারী একজন রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব, একজন পরিশুদ্ধ চিন্তাসম্পন্ন ব্যক্তি। তিনি নিজ দায়িত্ব ও কাজে ছিলেন কর্তব্যনিষ্ঠ। তিনি সততাকেই নিজের পুঁজি হিসেবে প্রমাণ করেছিলেন। এগুলো কথার কথা নয়, তাঁর সারাজীবনের কাজে তিনি এই প্রমাণই রেখে গেছেন।
শারমিন আহমদ লিখেছেন, 'সত্যি শক্তি। সত্য তার আপন বলে বলীয়ান।' এই নীতির একনিষ্ঠ অনুসারী আব্বু লড়েছেন একাকী।' তিনি ছিলেন নিঃসঙ্গ এক লড়াকু, যিনি নিজের জন্য কিছু প্রত্যাশা করেননি। যতদিন এই লড়াকুকে শেখ মুজিব কাছে রাখতে পেরেছেন ততদিন শেখ মুজিব ছিলেন অপ্রতিদ্বন্দ্বী, অপরাজেয়! কিন্তু দেশ স্বাধীন হবারর পরে যেইদিন তিনি তাজউদ্দীন আহমদকে দূরে সরিয়ে দিলেন, সেইদিন থেকেই যেন তাঁর 'পারমী' বা 'খোদার করুণা' কৃশ আবছা ঝাপসা হতে শুরু করে!
তবে তাজউদ্দীন আহমদ এমন ধাতে গড়া এক মানুষ, যিনি এত সকল কিছুর পরেও, নিজের 'নেতা'র কাছ থেকে এতো অবহেলা, বঞ্চনার শিকার হবার পরেও কোনোকালেই, কোনোসময়েই 'নেতা'র বিপরীতে কোনো অমংগল কাজ করা দূরে থাক, মনেমনেও সেই কামনা করেননি।
এই এক লৌহদৃহ মানবিক মননের অধিকারী ব্যক্তি আজ থেকে ৯২ বছর আগে ১৯২৫ সালের ২৩ জুলাই গাজীপুরের কাপাসিয়া দরদরিয়ায় জন্মেছিলেন। ধন্য এমন মানব জনম, সার্থক এমন জীবন যাপন!
এই ব্যক্তি, যিনি মনেপ্রাণে ছিলেন এই দেশেরই বৃহত জাতির একজন, বাঙালি। আবেগে চিন্তায় তিনি ছিলেন খাঁটি আদর্শবান অনুসরনীয় একজন 'বাঙালি'ই, তবে একইসাথে মানবতাবাদীও। কিন্তু, অত্যন্ত বেদনার যে,
আজ বৃহত 'বাঙালি' জাতিগোষ্ঠির মধ্যে এই ব্যক্তিত্বকে নিয়ে ভাবার মতো নেই কেউ, তাঁর আদর্শকে তুলে ধরে অনুসরনীয় হবার মতোও নেই এমন কোনো অনুসরনীয় কোনো ব্যক্তিত্ব!
তিনি বলেছিলেন, ‘শুধু ভালো বক্তৃতা করে দেশের মানুষের মঙ্গল করতে পারবেন না। বক্তৃতা সত্যি হতে হবে। মানুষের সত্যিকার অবস্থা আগে তুলে ধরে তারপর প্রকৃত নির্দেশ দিতে হবে। এর নাম নেতৃত্ব। এটা খুবই কষ্টকর। কিন্তু সত্যিকার খায়েশ যদি হয়ে থাকে তা হলে তা করতে হবে। কিন্তু এছাড়া শুধু বক্তৃতা করে বেশি দিন নেতৃত্ব করা যাবে না।’(সূত্রঃ শুভ কিবরিয়া, বাংলা ট্রিবিউন)
আজকাল কথা বলার লোক বা ভুরি ভুরি ভালো ভালো কথা লেখার লোক তো কম পাওয়া যায় না! বরং ভালো ভালো কথা বেশিই যেন বলা হয়ে থাকে, লেখা হতে থাকে! টিভি টকশো'তে চোখ কান দিলেই তা গোচরীভূত হতে থাকে!
আজ ২৩ জুলাই ২০১৭ পর্যন্ত যদি তাজউদ্দীন বেঁচে থাকতেন তবে তাঁর বয়স হতো ৯২। এই বয়সেও অনেকেই বেঁচে থাকেন। শুনেছি মালয়েশিয়ার মাহাথির মুহাম্মদ এই বয়সে আবার রাজনীতিতে নাকি আসতে চাইছেন।
কিন্তু, তাজুদ্দীন ৫০ পেরোতে পারেননি। ১৯৭৫ সালের আগস্ট মাসের ২২ তারিখ তাঁকে আটক করা হয়। একই বছরের ৩ নভেম্বর আরো তিন নেতা- সৈয়দ নজরুল ইসলাম, ক্যাপ্টেন এম মনসুর আলী, এ এইচ এম কামরুজ্জামানসহ তাজউদ্দীনকে কারাগারে খুন করা হলো নির্মমভাবে।
শেখ মুজিব খুন হবার পরে তিনি নিজের প্রাণ রক্ষার জন্য পালিয়ে যেতে পারতেন। কিন্তু 'অপবাদ' মাথায় নিয়ে তিনি পালিয়ে যেতে চাননি। তবে তিনি যদি পালিয়ে যেতেন, রক্ষা করতেন নিজেকে, তিনি যদি আবার হাল ধরতেন দেশ গঠনের কাজে, তবে দেশের ইতিহাস কি অন্যভাবে লিখতে হতো?
যা হয়নি, তা হবার নয়। তাই ও কথা তোলা থাক অগোছালো!
এই সত্যটিই আজ প্রকটিত হয়ে আমাদের শিক্ষা দিক যে, 'নেতা যখন অসৎ, অযোগ্য, দুর্নীতিপরায়ণ ও সুবিধাবাদীদের কাছে টেনে নেন এবং তাদের প্রশ্রয় দেন তখন ভয়াবহ পরিণাম শুধু তার ভাগ্যেই ঘটে না, পুরো জাতিকেই তার মাশুল দিতে হয়। জাতি পিছিয়ে যায় শত বছর।'(তাজউদ্দীন আহমদ, নেতা ও পিতা; পৃঃ ১৭৫; শারমিন আহমদ)
তবে নেতা বা নেতৃত্ব যখন জাতীয় উত্তুঙ্গ উত্তাল ঝঞ্ঝাবিক্ষুব্ধ সময়ে সঠিক দিশা হাজির করে নেতৃত্ব দিতে অপারগ হন বা সঠিক ভুমিকা রাখতে সমর্থ না হন, তবে তখনও একটি জাতিকে, একটি জাতিগোষ্ঠি ও একটি অঞ্চলের জাতিসমষ্টিকে মাশুল গুণতে হয়, পিছিয়ে যেতে হয় আরো বহু বছর।

Sunday, July 30, 2017

জেনারেল অং সান General Aung San




তারিখঃ ১৯ জলাই, ২০১৭

বার্মা, এবং বর্তমানে মিয়ানমার নামে পরিচিত দেশটি গঠনে যিনি নেতৃত্ব দিয়েছিলেন তাঁর নাম অং সান, জেনারেল অং সান। আজ ১৯ জুলাই, ২০১৭ তাঁর ৭০ তম মৃত্যুবার্ষিকী। মিয়ানমারের জনগণ আজ তাঁকে স্মরণ করছে।

দেশটি স্বাধীন হবার মাত্র ৬ মাস আগে তিনি ১৯৪৭ সালের ১৯ জুলাই আততায়ীর হাতে শহীদ হন।

তাঁর দেশের বিভিন্ন জাতিসত্তাসমূহের মাঝেও তিনি ব্যাপকভাবে সম্মানিত রাষ্ট্রনেতা হিসেবে বিবেচিত হন।

বার্মা স্বাধীন হলে অন্যান্য জাতিসত্তাসমূহকে সমমর্যাদার ভিত্তিতে অধিকার প্রদান করার প্রতিশ্রুতি তিনি প্রদান করেন। এ উপলক্ষে তিনি জাতিসত্তাসমূহের প্রতিনিধিদের সাথে 'পাঙলঙ এগ্রিমেন্ট' নামে একটি চুক্তি সম্পাদন করেন। এই চুক্তি এখনো মিয়ানমারে জাতিসত্তাসমূহের অধিকার আদায়ের লড়াইয়ে প্রধান ভিত্তি বা পথনির্দেশদাতা হিসেবে বিবেচিত হয়।

অং সানের কন্যা অং সাং সু'কি এখন 'স্টেট কাউন্সিলর' হিসেবে দেশটির শাসনক্ষমতার নেতৃত্বে রয়েছেন।

রাজীব হুমায়ুন স্যার চলে গেলেন


তারিখঃ ০৫ জুলাই, ২০১৭
দোষেগুণে তিনি মানুষ ছিলেন। তাঁর ছাত্র ছিলাম আমি এবং আরো অনেকেই ছিলেন। বন্ধুদের অনেকে তাঁকে সমালোচনা করতো। আমিও মাঝে মাঝে তাঁর কথা শুনে মেলাতে পারতাম না! 
তিনি বারবার বলতেন, তিনি নাকি প্রধানমন্ত্রী/বিরোধী দলীয় নেত্রীর শেখ হাসিনা'র বন্ধু ছিলেন। তাঁকে সরাসরি প্রশংসা করলে তিনি যে খুশি হতেন তা জানা ছিল। তিনি সুযোগ পেলেই নিজের কথা বলতেন।
তারপরেও তিনি ছিলেন আমার আমাদের শিক্ষক। তিনি ভাষাতত্ত্ব, পরে ভাষাবিজ্ঞান বিভাগের চেয়ারম্যান ছিলেন।
আসলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হবার সময় ভাইবা বোর্ডে তিনি আমাকে উক্ত বিভাগে ভর্তি হতে একপ্রকার অনুরোধ করেছিলেন।
কিছুদিন আগে ঢাকায় গিয়ে তাঁর এক আত্মীয়ের সাথে দেখা হয়। এ সময় স্যারের সাথে দেখা করার আন্তরিক ইচ্ছে প্রকাশ করেছিলাম। তবে যা হয়, সারাজীবন ইন্ট্রোভারট থাকায় অনেক ইচ্ছে বাস্তবে রূপান্তর করা হলো না। স্যারকে আর দেখতে পেলাম না।
আজ যখন শুনলাম তিনি মারা গেছেন, তখন হঠাত মনটা খুব শুন্য মনে হলো। 
কখন যে দুটো চোখে অশ্রু জমা হলো জানতে পারিনি। তিনি আমাকে হয়তো খুব ভালো বাসতেন। এবং কী জানি এক অন্য কারণে তাঁকে আমি শ্রদ্ধা করতাম।
আজ মনে হলো তিনি মারা যাওয়ায় একটি তীব্র রোদের সময় ছায়া দেয়া একটি আপন বৃক্ষের পতন যেন আমি দেখলাম।
সম্ভব হলে একদিন তাঁর কবরে গিয়ে শেষ শ্রদ্ধা জানাবো।
নিচে Dipongker Goutam নামে একজন ফেসবুক বন্ধুর স্যারকে নিয়ে লেখাটি শেয়ার করলাম
রাজীব হুমায়ুন স্যার আর নেই
----------------------------------------
বিশিষ্ট ভাষাবিদ, নজরুল গবেষক ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক অধ্যাপক ড. রাজীব হুমায়ুন মৃত্যুবরণ করেছেন।
মঙ্গলবার দিবাগত রাত ২টা ৫ মিনিটে তিনি রাজধানীর একটি হাসপাতালে শেষ নি:শ্বাস ত্যাগ করেন। মৃত্যুকালে তার বয়স হয়েছিলো ৬৭ বছর।
১৯৫০ সালে সন্দ্বীপে জন্ম নেওয়া হুমায়ুন ভাষাবিজ্ঞানে পিএইচডি করে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলা বিভাগে যোগ দেন। পরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগে এবং ভাষাবিজ্ঞানের প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারপার্সনও ছিলেন তিনি।পুরানো ঢাকার ভাষা নিয়ে তার কাজ ছিলো খুবই উল্লেখোগ্য।
যুদ্ধাপরাধী জামায়াত নেতা মীর কাসেম আলীর হাতে নির্যাতনে নিহত কিশোর মুক্তিযোদ্ধা রাজীব হুমায়ুনের বড় ভাই জসিম । তিনি মীর কাসেমের মামলার অন্যতম সাক্ষী ছিলেন।
চট্টগ্রাম উদীচীর সঙ্গে তিনি ওতপ্রোতভাবে যুক্ত ছিলেন। ১৯৭৮ সালে তিনি প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হয়েছিলেন। তার জীবন ও কর্মের প্রতি জানাই শ্রদ্ধাঞ্জলি

লালা ভাইয়ের বিরুদ্ধে 'রাষ্ট্রদ্রোহ' মামলা


তারিখঃ ০৭ জুলাই/ ২০১৭
জাতীয় মুক্তি কাউন্সিলের সাধারণ সম্পাদক ফয়জুল হাকিম লালা; লালা ভাই। এরশাদশাহী শাসনের অবসান ঘটাতে ছাত্র থাকা অবস্থায় তিনি সামরিক শাসন বিরোধী আন্দোলন করেছেন। তবে তাঁর সমসাময়িক অন্য ছাত্রনেতারা এরপরে বিত্তবৈভবপ্রাপ্ত এবং পতাকাশোভিতও হয়েছেন কেউ কেউ। লালা ভাই তাঁর স্বভাবসুলভ স্বাভাবিক ভিন্নচিন্তা, অবিলাসী ও মননশীল মানবিক মন নিয়ে কাজ করে গেছেন রাজপথে ময়দানে। তিনি কী পেরেছেন বা রাজপথে কিছু একটা করতে পেরেছেন কী না তা জানতে পারা যেত না, যদি তাঁর বিরুদ্ধে রাষ্ট্রদ্রোহ মামলা না হোত!
আমরা জানি, সচরাচর তিনি ঢাকায় অনলবর্ষী বক্তব্য দেন। এবং এই বক্তব্যের বিষয়বস্তু অবশ্যই সরকার ও শাসকশেনির বিরুদ্ধে। তবে তাঁর তথ্যপূর্ণ বক্তব্য সাধারণ শ্রোতার জন্য আকর্ষণ সৃষ্টিকারী বলা যায়। যদিও হয়তো, শ্রোতা বিচারে বা সমাবেশে অংশগ্রহণকারী বিচারে হয়তো তিনি জাতীয়ভাবে কোটি জনগণের উপর প্রভাব রাখেন না। তবে তাঁর বক্তব্য যাঁরা শোনেন, তাঁরা তাঁর প্রতি কিছুটা আকৃষ্ট বা নিরাকৃষ্টও হন অবশ্যই। তা না হলে রাজশাহীর চারঘাটের বক্তব্যে আওয়ামীলীগের স্থানীয় শ্রোতাদের তো এতোটা 'হন্তদন্ত' ও হস্তউত্তোলিত ও মামলা রুজু করার জন্য বিশেষ চিন্তিত হবার কথা তো নয়!
তাঁর বিরুদ্ধে রাষ্ট্রদ্রোহ মামলা প্রত্যাহার হোক এই দাবি রইল।
তিনি রাজশাহীর চারঘাটে কী বিশেষ বক্তব্য দিয়ে 'রাষ্ট্রদ্রোহ' মামলায় অভিযুক্ত হয়েছেন, তাও আমরা জানতে চাই। এতে আমরাও সতর্ক হতে পারবো! কারণ, একে তো ৫৭ ধারার ফারা, তার উপর 'রাষ্ট্রদ্রোহ' মামলা, এতো ভার কেই বা বহন করতে চাইবে! তাই বোঝাটা নিয়ে একটু ধারণা অন্তত এতে পাওয়া যাবে ও সতর্ক হওয়া যাবে!

Friday, December 2, 2016

জেনি ফন ভেস্টফালেন- সমাজ পরিবর্তনের দর্শন প্রতিষ্ঠার প্রধান অংশীদার এবং কার্ল মার্কসের সহধর্মিনী


তারিখঃ ২ ডিসেম্বর, ২০১৬
জেনি ফন ভেস্টফালেন বা জেনি মার্কস। তিনি কার্ল মার্কসের স্ত্রী হিসেবে পরিচিত। কার্ল মার্কসের সহধর্মিনী হিসেবে তিনিও সমাজ পরিবর্তনের বিপ্লবী দর্শনকে তাত্ত্বিকভাবে প্রতিষ্ঠিত করতে ভূমিকা রেখেছিলেন। প্রুশিয়ার অভিজাত পরিবারের সন্তান হিসেবে উত্তর জার্মানের সলসভেদেলে শহরে ১৮১৪ সালের ১২ ফেব্রুয়ারী তাঁর জন্ম। মৃত্যু হয় ১৮৮১ সালের ২ ডিসেম্বর। ৬৭ বছর পর্যন্ত তিনি বেঁচে ছিলেন। সাত সন্তানের জননী হয়েছিলেন। কার্ল মার্কসকে বিয়ে করার পরে তাঁর নাম হয়ে যায় জেনি মার্কস। তাঁর পুরো নাম জোহানা বার্থা জুলিয়া জেনি ফন ভেস্টফালেন।

১৮১৬ সালের দিকে জেনি মার্কসের পিতা ট্রিয়ার শহরে চলে আসেন। সেখানে কার্ল মার্কসের পিতা ও জেনি ফন ভেস্টফালেনের পিতার মধ্যে বন্ধুত্ব ছিল। কার্ল মার্কস তখন ১৩ বছরের বালক।  সেই বয়সেওি তার চোখেমুখে ছিল বিদগ্ধতার ছাপ।  জেনি মার্কসের বাবা ব্যারন লুডভিগ ফন ভেস্টফালেন তাকে নিয়ে হাঁটতে বেরোতেন। এসময় তিনি কার্ল মার্কসকে দান্তে, হোমার, গ্যেটে, শেকসপীয়ারে লেখা থেকে উদ্ধৃতি শোনাতেন। তাঁরা ইউরোপের রাজনীতি নিয়ে আলোচনা করতেন। লুডভিগ ভেস্টফালেন কার্ল মার্কসকে ফ্রেঞ্চ ইউটোপীয়ান সমাজতান্ত্রিক সেইন্ট শিমনের লেখা পড়তে দিতেন। বস্তুত, কার্ল মার্কস যে সমাজ পরিবর্তনের রাজনৈতিক দর্শনের প্রতি আকৃষ্ট হন তার মূলে ছিল জেনির পিতা লুডভিগ ফন ভেস্টফালেনের এই ভূমিকা। এবং কার্ল মার্কস যখন বিশ্ববিদ্যালয়ে তার পিএইচডি থিসিস লেখেন তখন তিনি থিসিসের মুখবন্ধে ব্যারন লুডভিগ ভেস্টফালেনের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন। জেনি মার্কসও তার পিতার উত্তরাধিকার বহন করেছেন। তিনিও ছিলেন বিদুষী মহিলা। বিভিন্ন বিষয়ে তাঁর জানাশোনা ও লেখাপড়া ছিল। তিনি একই সাথে ছিলেন আকর্ষনীয়া- ট্রিয়ার শহরে বহু যুবক তরুণের স্বপ্নসাথী। 
তবে হয়তো বা সেই সময়ের পরিস্থিতিতে ইউরোপের মত মুক্ত সমাজব্যবস্থার দেশেও কার্ল মার্কসের মত ভুমিকা জেনি মার্কস নিতে পারেননি। অথবা, কার্ল মার্কসকে  তার আরাধ্য কাজের সুযোগ করে দিয়ে তিনি শ্রমবন্টনের নিয়ম অনুযায়ী প্রধানত গৃহিণীর কাজে নিজেকে জড়িয়ে নিয়েছিলেন স্বেচ্ছায়। নতুবা তিনিও হতে পারতেন বিদুষী কোন লেখিকা অথবা নারী দার্শনিক!
 জেনি মার্কসের মত একজন নারীকে কার্ল মার্কস স্ত্রী হিসেবে পেয়েছিলেন বলেই হয়ত কার্ল মার্কস হতে পেরেছিলেন একজন সমাজ পরিবর্তনের পথপ্রদর্শক দার্শনিক ও বিপ্লবী! জেনি মার্কসের মেয়ে এলিনর মার্কস এভেলিং তার মা’কে স্মরণ করে লিখেছিলেন, স্ত্রী জেনী মার্কসের সহায়তা না পেলে কার্ল মার্কস কোন কিছুই করে যেতে পারতেন না।
আর কার্ল মার্কসও জেনি মার্কসকে ছাড়া ছিলেন যেন হালবিহীন বা পালবিহীন নৌকার মতো। ম্যারী গ্যাব্রিয়েল ’লাভ এন্ড ক্যাপিটাল: কার্ল এন্ড জেনী মার্কস এন্ড বার্থ অব এ রেভ্যলুশন’ বইয়ে কার্ল মার্কসের জীবনে জেনি মার্কসের অপরিহার্যতা সম্পর্কে মন্তব্য করে বলেছিলেন, ’ তিনি(জেনি মার্কস) কার্ল মার্কসের শুধুমাত্র একজন বন্ধু এবং প্রণয়ী বা প্রেমিকাই ছিলেন না। তাদের দু’জনের মধ্যে পরিণয় বন্ধনের ১৩ বছর আগে থেকেই জেনি মার্কস ছিলেন কার্ল মার্কসের বিশস্ত  বৌদ্ধিক আলোচনার সহসাথী। জেনি মার্কসকে ছাড়া কার্ল মার্কসের হৃদয় এবং বুদ্ধিজ্ঞানও কাজ করত না(Neither his heart nor his head functioned without her.) ) ।
জেনি মার্কসের সাথে কার্ল মার্কসের ছোটকাল থেকেই পরিচয় ছিল। জেনি মার্কসের ছোটভাই এডওয়ার্ড ফন ভেস্টফালেনের সাথে কার্ল মার্কসের বন্ধুত্ব ছিল। কার্ল মার্কস জেনী মার্কসের চেয়ে বয়সে ৪ বছরের ছোট ছিলেন। ১৮৪৩ সালের ১৯ জুন তারা দু’জন ট্রিয়ারের কাছে ক্রোয়েটসনাখ শহরে খ্রিস্টান বিবাহ রীতি অনুযায়ী বিয়ে করেন। এর আগে ১৮৩৬ সালের দিকে তারা গোপনে বাগদান সম্পন্ন করেন। ১৮৪৩ সালে যখন তাদের বিয়ে হয় তখন জেনি মার্কসের বয়স ছিল ২৯ বছর আর কার্ল মার্কসের বয়স ছিল ২৫ বছর। 
বিয়ের পরে তারা প্যারিসে চলে যান। সেখানে ১৮৪৪ সালের মে মাসের প্রথম সপ্তাহে তাদের প্রথম সন্তান জেনিচেন বা জেনী জন্ম নেন। পরে প্যারিস থেকে জেনি ট্রিয়ারে তার মায়ের কাছে চলে যান। সেখান থেকে তিনি কার্ল মার্কসকে কয়েকটি চিঠি লেখেন। চিঠিতে দেখা যায় তিনি তাদের ভবিষ্যত সম্পর্কে দুশ্চিন্তা প্রকাশ করছেন। ১৮৪৪ সালের ২১ জুন কার্ল মার্কসকে তিনি লেখেন- 
প্রিয়তম আমার, প্রায়ই আমি গভীরভাবে আমাদের কাছের এবং দূরের ভবিষ্যত নিয়ে চিন্তিত হয়ে পড়ি। এবং এখন যেভাবে নিশ্চিন্ত হাসিখুশী জীবন কাটাচ্ছি তার জন্য আমাকে মূল্য দিতে হবে নিশ্চয়ই। সম্ভব হলে আমাকে এ বিষয়ে পরামর্শ দিও যেন আমি এভাবে চিন্তিত না হই। সবাই একটা নিশ্চিত আয়ের পথ খুঁজে নিতে বলে।  এসকল পরামর্শ শোনার পরে আমি একগাল হাসি দিয়ে বা গালে হাত দিয়ে বা পরনের কাপড় নেড়েচেড়ে বা মাথার টুপি নিয়ে খেলা করে বা চুল নাড়তে চাড়তে সাধারণ উত্তর দিয়ে যাই। কিন্তু এরপরে আমার বুকে যে ছটফটানি ধরে এবং ভবিষ্যত চিন্তা আমাকে যেভাবে উদ্বিগ্ন করে তা দেখার তো আর কেউ থাকে না। 
(Dearest heart, I am often greatly worried about our future, both that near at hand and later on, and I think I am going to be punished for my exuberance and cockiness here. If you can, do set my mind at rest about this. There is too much talk on all sides about a steady income. I reply then merely by means of my rosy cheeks, my clear skin, my velvet cloak, feather hat and smart coiffure. That has the best and deepest effect, and if as a result I become depressed, nobody sees it.)
তবে এরপরই তিনি একই চিঠিতে কার্ল মার্কসকে লেখালেখি বিষয়ে পরামর্শ প্রদান করেন। তিনি লেখেন-
 শুধুমাত্র বিদ্বেষাত্মক ও খিটখিটে টাইপে লেখালেখি করো না। তুমি জানো, তোমার লেখা কতটা পরিমাণে প্রভাবিত হয়ে থাকে। বস্ত যা তা-ই লিখো এবং গভীরে গিয়ে লিখো অথবা সরস হাল্কাচালে লেখার চেষ্টা করো।
 (Only don't write with too much rancour and irritation. You know how much more effect your other articles have had. Write either in a matter-of-fact and subtle way or humorously and lightly.)
 ১৮৪৪ সালের আগস্ট মাসে এঙ্গেলসের সাথে কার্ল মার্কসের দেখা হয় এবং তারা বুদ্ধিবৃত্তিক দার্শনিক আলোচনা চালিয়ে যান। পরে তাদের এই বুদ্ধিবৃত্তিক বৌদ্ধিক বন্ধুত্ব ইতিহাসে অমর হয়ে যায়। এঙ্গেলসের সাথে আলাপ হবার পরে তারা দুইজনে মিলে জার্মানীর সাইলেসীয় তাঁতীদের সংগ্রামে ভুমিকা রাখেন। জার্মানীর সরকার এতে ক্ষুব্ধ হয় এবং কার্ল মার্কসকে প্যারিস থেকে বহিস্কার করতে ফ্রান্স সরকারকে অনুরোধ জানায়।  ১৮৪৫ সালের প্রথম দিকে কার্ল মার্কসকে ২৪ ঘন্টার মধ্যে প্যারিস ছাড়তে বলে ফ্রান্স পুলিশ।
ফ্রান্স সরকার জেনী মার্কসকে আরো কিছুদিন থাকতে অনুমতি দেয়। পরে জেনি মার্কস ঘরের আসবাবপত্র সম্পত্তি সরঞ্জাম বিক্রি করে ব্রাসেলসে যাওয়ার টাকা সংগ্রহ করেন এবং ব্রাসেলসে কার্ল মার্কসের কাছে চলে যান। ব্রাসেলসে তারা চরম অর্থকষ্টে পড়েন। ১৮৪৫ সালের সেপ্টেম্বরে তাদের দ্বিতীয় সন্তান লরা মার্কসের জন্ম হয়। 
১৮৪৬ সালে ব্রাসেলসে কার্ল মার্কস ও এঙ্গেলস কম্যুনিস্ট যোগাযোগ কমিটি প্রতিষ্ঠা করেন এবং ইউটোপীয় সমাজতন্ত্রীদের ভ্রান্ত দর্শনের বিরুদ্ধে লেখালেখি চালিয়ে যান। এসময় জেনী মার্কস কার্ল মার্কসের লেখালেখিতে সহায়তা করেন। তিনি কার্ল মার্কসের হিজিবিজি লেখাগুলো সুন্দর হস্তাক্ষরে লিখে দিতেন। এছাড়া অন্য কাজেও তিনি মার্কসকে সহায়তা করতেন। 
পোল লাফার্গ তাঁর কার্ল মার্কস স্মরণে প্রবন্ধে সম্পর্কে লিখেছেন- কার্ল মার্কসের ”স্ত্রীর বুদ্ধিমত্তা ও ভালমন্দের বিচারবোধ সম্পর্কে এতখানি শ্রদ্ধা ছিল মার্কসের যে সকল পান্ডুলিপিই তিনি স্ত্রীকে দেখাতেন এবং তাঁর মতামতকে অপরিসীম মূল্য দিতেন। ১৮৬৬ সালে একথা তিনি নিজেই আমাকে বলেছিলেন। ছাপাখানায় পাঠানোর আগে স্বামীর পান্ডুলিপিগুলি শ্রীমতি মার্কস নিজের হাতে কপি করে দিতেন।
মদনমোহন গুহ তাঁর ’কার্ল মার্কসের জীবনে জেনি’ বইয়ে লেখেন- তাঁর(জেনি মার্কস) সময় কেটে যেতো মার্কসের লেখা প্রবন্ধগুলি কপি করতে করতে। তাতে তিনি আনন্দ পেতেন। পেতেন সান্ত¡না। তদুপরি প্রবন্ধগুলি কপি করতে গিয়ে সেগুলি তাঁর পড়া হয়ে যেতো। বেশ ভালভাবেই এরফলে বিশ্বের তদানীন্তন রাজনৈতিক পরিস্থিতি সম্পর্কে তিনি ওয়াকিবহাল হবার সুযোগ পেতেন।(পৃ: ৫৯)
১৯৪৭ সালের ফেব্রুয়ারীতে তাদের তৃতীয় সন্তান এডগারের জন্ম হয়। তাদের এই সন্তান ১৯৫৫ সােেল ৮ বছর বয়সে মারা যান। 
১৯৪৮ সালের মার্চ মাসের ৩ তারিখ প্রুশিয়া সরকারের অনুরোধে বেলজিয়াম সম্রাটের স্বাক্ষরে  কার্ল মার্কসকে ২৪ ঘন্টার মধ্যে ব্রাসেলস ছেড়ে যেতে বলা হয়। ব্রাসেলসের পুলিশ তাকে আটক করে পুলিশ হাজতে রেখে দেয়। জেনি মার্কস  থানায় তার খোঁজ নিতে গেলে পুলিশ তাকেও থানায় আটকে রাখে। পরদিন তাদের মুক্তি দেয়া হলেও তাদেরকে ৫ মার্চের মধ্যে ব্রাসেলস ছেড়ে প্যারিসে চলে যেতে হয়। যাবার সময় তারা কোন কিছুই নিয়ে যেতে পারেননি। জেনি মার্কস তাঁর এক স্মৃতিকথায় এ বিষয়ে লিখেন- চলে আসার সময় দিনটা ছিল ঠান্ডা, মেঘে-ঢাকা, বিরস আর বাচ্চাদের শরীর গরম রাখা শক্ত হয়ে পড়েছিল। এদিকে আমার কোলের বাচ্চার বয়স তখন মাত্র এক বছর। 
 প্যারিসে কিছুদিন থাকার পরে সেখানেও পুলিশ এসে তাদের প্যারিস ছাড়তে বলল। এরপর তারা চলে যান জাার্মানে। 
১৯৪৮(৪৯?) সালের মে মাসের দিকে জেনী ৪র্থ বারের মত অন্তঃস্বত্বা হন। বিপ্লবী কাজের জন্য জার্মান থেকে  কার্ল মার্কস ও এঙ্গেলসকে বিতাড়িত হতে হলো। এবার আরকেবার কপর্দকশুন্য অবস্থায় জেনী মার্কসকে ঘর ছাড়তে হলো। তাকে গর্ভবতী সন্তানসহ আরো তিন সন্তানকে নিয়ে আশ্রয় নিতে হলো ট্রিয়ারে তার মায়ের কাছে। চতুর্থ সন্তান হেনরী এডওয়ার্ড গুইডো ১৯৪৯ সালের সেপ্টেম্বরে জন্মগ্রহণ করেন। তবে একবছর না হতেই তাদের এই সন্তান মারা যায়। 
১৮৪৯ সালের সেপ্টেম্বর মাসে জেনি মার্কস ও কার্ল মার্কস লন্ডনে আসেন। কয়েকদিন হোটেলসহ বিভিন্ন স্থানে থাকার পরে তারা সোহো নামক এলোকার ৬৪ নং ডিন স্ট্রীটের একটি বাড়িতে উঠেন। এসময় তাদের পরিবারে চরম অর্থনৈতিক বিপর্যয়ের কাল চলতে থাকে। 
১৮৫০ সালের ২০ মে জেনি মার্কস ফ্রাঙ্কফুর্টের জনৈক ভাইডেমারের কাছে একটি মর্মস্পর্শী চিঠি লিখেন। এই চিঠিতে বোঝা যায় তারা কী নিদারুণ অর্থকষ্টে জীবন অতিবাহিত করেছেন। কিন্তু তারপরেও জেনী মার্কস বিপ্লবকে বিসর্জন দেয়ার কথা চিন্তা করেননি। ভাইডেমায়ারের কাছে তিনি লেখেন- ’ ... কার্লের প্রাপ্য কিছু পারিশ্রমিক পেয়ে থাকলে কিংবা ভবিষ্যতে পেলে যত তাড়াতাড়ি সম্ভব তা যেন আমাদের পাঠিয়ে দেন। টাকাটা আমাদের ভীষণ, ভী-ষ-ণ দরকার।’
আর্থিক অভাব অনটনের কথা লেখার পরে তিনি লেখেন- মনে করবেন না এইসব তুচ্ছ ছোটখাটো দুঃখ দুর্দশা, ভাবনা চিন্তা আমার মনোবল নষ্ট করে দিয়েছে। আমি খুব ভালো করেই জানি যে আমাদের সংগ্রাম বিচ্ছিন্ন কোন ব্যাপার নয়। ...। সত্যি সত্যি যা আমার আত্মাকে কষ্ট দিচ্ছে এবং হৃদয়কে রক্তাক্ত করছে, তা হলো এই চিন্তা যে, ছোট খাটো ব্যাপারের জন্য আমার স্বামীকে কতোই না কষ্ট সহ্য করতে হচ্ছে, আমার পক্ষে কত সামান্য পরিমাণেই না তার সাহায্যে আসা সম্ভব হচ্ছে, এবং যিনি স্বেচ্ছায় ও সানন্দে অসংখ্য লোকের উপকার করে এসেছেন, তিনি নিজে কত না অসহায়! কিন্তু তাই বলে, প্রিয় হের ভাইডেমার, ভুলেও এ কথা ভাববেন না যে, আমরা কারো কৃপাপ্রার্থী। (সূত্রঃ কার্ল মার্কস মানুষটি কেমন ছিলেন, জাকির তালুকদার, পৃ:১০৩, ঐতিহ্য, ফেব্রুয়ারি, ২০১৫)
এ সময় তাদের সংসারের টানাটানি থাকলেও তাদের বাড়িতে যখন কেউ আসতেন তাদেরকে জেনি নিজের সাধ্যমত আপ্যায়ন করার চেষ্টা করতেন। পোল লাফার্গ তার কার্ল মার্কস স্মরণে প্রবন্ধে লিখেছেন- সকল দেশের বহু শ্রমিকই শ্রীমতি মার্কসের আতিথেয়তায় ধন্য হয়েছেন। 
সংসারের টানাটানি সামাল দিতে তিনি হল্যান্ডে মার্কসের মামা লিওন ফিলিপসের কাছে সহায়তা চান। কিন্তু ফিলিপস সহায়তা দেননি। এসময় তিনি খুব ভেঙে পড়েন। 
তাদের পঞ্চম সন্তানের নাম জেনি ইভালিন ফ্রান্সিস। ১৮৫১ সালের ২৮ মার্চ তার জন্ম হয়। ১৮৫২ সালের ১৪ এপ্রিল এক বছরের কিছু বেশি সময় বেঁচে থেকে তিনি মৃত্যুবরণ করেন।  
১৮৫৫ সালের ১৬ জানুয়ারি ৬ষ্ঠ সন্তান জেনি জুলিয়া এলিযেনর জন্মগ্রহণ করেন। ৭ম সন্তানটি ১৮৫৭ সালের ৬ জুলাই জন্মগ্রহণ করে এবং মারা যায়। সেই সময়গুলোতে  অনেক সময় তারা তাদের পরিবারের জন্য দু’বেলা দু’মুঠো ভাত জোগাড় করতে পারতেন না। পরে তার এক বান্ধবী লীনা শ্যোলা তার বাড়িতে আসেন। জেনির দুরবস্থা দেখে তিনি ব্যথিত হন এবং জেনিকে কিছু সহায়তা করেন। পরে ১৯৬০ সালে তারা আবার অর্থকষ্টে পড়েন। কার্ল মার্কস আমেরিকার ট্রিব্রিউন পত্রিকায় লেখালেখি করে যে আয় করতেন তা কমে যায়। ঠিক সেই সময়ে জেনি মার্কস বসন্ত রোগে আক্রান্ত হন। রোগের কারণে তার দুই চোখ নষ্ট হতে বসেছিল। 
অপরদিকে তার মেয়েদেরও বয়স বাড়ছিল। বয়সের সাথে সাথে তাদের নানা আনুষঙ্গিক খরচও বেড়ে যাচ্ছিল। অথচ সে অনুযায়ী আয় উপার্জন ছিল না। তবে ১৯৬৪ সালের দিকে কার্ল মার্কসের মামা/কাকা মারা গেলে তিনি উত্তরাধিকারসূত্রে কিছু সম্পত্তি ও অর্থ পান। এ সময় তারা কিছুটা অনটন থেকে রক্ষা পান। একইসাথে এঙ্গেলসও ১৯৫০ থেকে তাদের পরিবারকে মাঝে মাঝে আর্থিক সহায়তা দিতেন। এভাবেই তাদের সংসার জীবন কেটে যাচ্ছিল। জেনি মার্কস বিচক্ষণতার সাথে এই সমস্যা মোকাবেলা করে আসছিলেন এবং কার্ল মার্কসের লেখালেখি ও রাজনৈতিক কাজ যেন থেমে না থাকে সেই চেষ্টা তিনি করে যাচ্ছিলেন। 
জেনি মার্কসের চার সন্তান খুব কম বয়সে মারা যায়। বাকি তিন কন্যা সন্তান যারা বেঁচে ছিলেন তারাও নানাভাবে সংগ্রামে যুক্ত ছিলেন। 
১৮৮১ সালের ২ ডিসেম্বর জেনী মার্কসের মৃত্যু হয়। ৫ ডিসেম্বর হাইগেট সমাধিক্ষেত্রে তাকে সমাধিস্থ করা হয়। সমাধিক্ষেত্রে আইভি লতায় ঢাকা মার্বেল পাথরের উপর খোদাই করে জেনি ফন ভেস্টফালেনের নামের সাথে লেখা রয়েছে- কার্ল মার্কসের প্রিয়তমা পত্নী|(The Beloved Wife of Karl Marx).
 সমাধিক্ষেত্রে অন্ত্যেস্টিক্রিয়া অনুষ্ঠানে দাঁড়িয়ে এঙ্গেলস জেনী মার্কস সম্পর্কে বলেছিলেন, ”এই মহিলা, তার তীক্ষ্ণ বুদ্ধিমত্তা একইসাথে রাজনৈতিক বিচক্ষণতা, চরিত্রের মধ্যে ছিল উদ্যম এবং আবেগ, এবং সংগ্রামের ক্ষেত্রে তার সহযোদ্ধাদের প্রতি তাঁর অপরিসীম উৎসর্গীকৃত মানসিকতার মাধ্যমে গত ৪০ বছরে যে অবদান রেখে গেছেন তা কোনকালেই জনগণের কাছে প্রকাশ পায়নি এবং সমসাময়িক কোন সংবাদ মাধ্যমে এই কীর্তি ঘোষিত হয়নি। এটা এমন যা অভিজ্ঞতার মাধ্যমে আমরা অনুভব করেছি। 
কিন্তু এই একটি বিষয়ে আমি নিশ্চিত যে, রিফিউজি কমিউনের স্ত্রীরা তাকে প্রায়ই স্মরণ করবে, আর বাকি আমরাা তার সাহসী ও প্রাজ্ঞ পরামর্শ অবশ্যই মিস করবো....। 
আমি এখানে তার গুণাবলীর কথা বলতে চাই, যা তার বন্ধুরা জানে এবং স্মরণে রাখবে, তা হল, অপরকে সুখী করে যিনি নিজে সুখী বোধ করেন, তিনি হলেন তাই।” 
(The contribution made by this woman, with such a sharp critical intelligence, with such political tact, a character of such energy and passion, with such dedication to her comrades in the struggle — her contribution to the movement over almost forty years has not become public knowledge; it is not inscribed in the annals of the contemporary press. It is something one must have experienced at first hand.

But of one thing I am sure: just as the wives of the Commune refugees will often remember her — so to, with the rest of us have occasion enough to miss her bold and wise advice, bold without ostentation, wise without ever compromising her honor to even the smallest degree. I need not speak of her personal qualities, her friends know them and will not forget them. If there ever was a woman whose greatest happiness was to make others happy it was this woman.)
তথ্যসূত্রঃ
৮. কার্ল মার্কস মানুষটি কেমন ছিলেন, জাকির তালুকদার, পৃ:১০৩, ঐতিহ্য, ফেব্রুয়ারি, ২০১৫।
৯. কীর্তিময় এক বন্ধুত্ব, শেখর দত্ত, বিপ্লবীদের কথা প্রকাশনা, নভেম্বর, ২০১৪।
১০. মার্কস এঙ্গেলস স্মৃতি, বোধি, বাংলাদেশ সংস্করণ, অমর একুশে গ্রন্থমেলা, ২০১১।
১১. কার্ল মার্কসের জীবনে জেনি, মদনমোহন গুহ, মিরান্দা পাবলিশার্স, পশ্চিমবঙ্গ বইমেলা, ২০০১।

Tuesday, April 7, 2015

কোথা থেকে শুরু করতে হবে?

রাশিয়ার অক্টোবর বিপ্লবের সার্থক রূপকার ভ্লাডিমির  ইলিচ উইলিয়ানভ লেনিন ইস্ক্রা বা স্ফুলিঙ্গ নামক পত্রিকার ১৯০১ সালের মে মাসে প্রকাশিত ৪র্থ সংখ্যায় লিখেছিলেন ছোটো একটি লেখা। শিরোনাম, ‘Where to Begin?’।
সেই লেখার প্রথমে তিনি লিখছেন, সাম্প্রতিক সময়ে বিশেষ জোর দিয়ে রাশিয়ান সোশ্যাল ডেমোক্র্যাটরা ‘কী করতে হবে’ এই বিষয় নিয়ে আলোচনা করছে। আমরা কী পথ গ্রহণ করবো ( যা নিয়ে গত ৮০ ও ৯০ দশকে আলোচনা হয়েছিল)তা নিয়ে এই আলোচনা নয়। বরং আমাদের পরিচিত পথ বা আদর্শের মধ্য থেকে আমরা কী বাস্তব পন্থা গ্রহণ করবো বা কীভাবে তা আত্মস্থ বা বাস্তবে রূপায়ণ করবো তা নিয়েই এই আলোচনা চলছে। রাজনৈতিক কাজের পদ্ধতি বা পরিকল্পনা নিয়ে এই আলোচনা।
এরপর তার লেখায় পার্টিতে চলমান বিভিন্ন চিন্তাধারা বা মতভেদ বিষয়ে তিনি কথা বলেন।
তিনি বলেন, লাইবনেখট-এর  উদ্ধৃতি ব্যবহার করা হচ্ছে- ‘যদি ২৪ ঘন্টার মধ্যে প্রেক্ষাপট বা পরিস্থিতির বদল হয় তবে ২৪ ঘন্টার মধ্যেই রণকৌশলও বদলে নিতে হবে।‘ (If the circumstances change within twenty-four hours, then tactics must be changed within twenty-four hours.”)
লেনিন পার্টিতে যারা উক্ত চিন্তা লালন করেন তাদের বিষয়ে বা তাদের দৃষ্টিভঙ্গি বিষয়ে তার উক্ত লেখায় তী্ব্র সমালোচনা করে লেখেন-
কোনো বিশেষ পরিস্থিতিতে আন্দোলনের কৌশল বা পার্টি সংগঠনের বিশেষ কিছু বিষয়ে ২৪ ঘন্টার মধ্যে কৌশল বদলানো সম্ভব । কিন্তু সাধারণভাবে, ধারাবাহিকভাবে এবং আবশ্যিকভাবেই সংগ্রামী ধারার সংগঠনের প্রয়োজনীয়তা বা জনগণের মধ্যে রাজনৈতিক লড়াই জারি রাখার প্রয়োজনয়তা আছে  কী না তা নিয়ে ২৪ ঘন্টা বা ২৪ মাসের মধ্যে নিজের দৃষ্টিভঙ্গি পাল্টাতে পারে একমাত্র সার্বিকভাবে নীতি বিবর্জিত ব্যক্তিগণই।
অর্থাৎ, সংগঠন ও সংগ্রাম ও জনগণকে সংগঠিত করার জন্য রাজনৈতিক কর্মসূচি বা রাজনৈতিক লড়াইয়ের প্রয়োজনীয়তার উপর তিনি গুরুত্বারোপ করেছেন।

তিনি আরো বলছেন,
পরিবর্তিত পরিস্থিতি বা সময়ের প্রেক্ষাপট পরিবর্তনকে যুক্তি হিসেবে তুলে ধরা নিতান্তই হাস্যকর। যে কোনো সময় তথা ‘একঘেয়ে শান্তিপূর্ণ’ সময়ে বা যেভাবেই বলি না কেন‘বিপ্লবী চেতনার ক্ষয়মানতার’ সময়েও সংগ্রামী ধারার সংগঠন গড়ে তোলা এবং রাজনৈতিক সংগ্রাম জারি রাখা আবশ্যিক অপরিহার্যভাবেই প্রয়োজনীয়। বিস্ফোরন্মুখ বা ঝাঁকুনির সময়ে সংগঠন দৃঢ় করতে গেলে দেরী হয়ে যাবে। মুহূর্তের মধ্যেই সক্রিয় ভূমিকা গ্রহণ করার মতো প্রস্তুতি বা সক্রিয়তা পার্টির মধ্যে থাকতে হবে।
এরপর তিনি ‘২৪ ঘন্টার মধ্যে কৌশল বা রণকৌশল বদলের’ দৃষ্টিভঙ্গিকে ভ্রান্ত প্রমাণের জন্য আলোচনা টেনে নেন।
তিনি বলেন, কিন্তু এই ‘রণকৌশল’ তথা ‘কৌশল’ বদলানোর জন্য আবশ্যিকভাবেই প্রয়োজন একটি ‘রণকৌশল’। এবং যেকোনো পরিস্থিতিতে বা যে কোনো সময়ে রাজনৈতিক সংগ্রাম সংঘটন করার মতো একটি করিৎকর্মা শক্তিশালী সংগঠন না থাকলে ধারাবাহিক কার্য পরিকল্পনা, দৃঢ়বদ্ধভাবে নীতিতে সম্মোহিত অবিচলতা, দ্রুততম উপায়ে কার্য সাধন ইত্যাদির প্রসঙ্গ বা প্রশ্ন আসে না বা থাকে না।
তিনি বারে বারে জনভিত্তির উপর প্রতিষ্ঠিত সংগঠন ও সংগ্রামের উপরই গুরুত্ব আরোপ করতে চেয়েছেন।
পরবর্তি আলোচনায় তিনি সন্ত্রাসবাদী কর্মপন্থা নিয়ে মতামত পেশ করেন। তিনি বলছেন,  কেন্দ্রীয় সংস্থার অস্তিত্ব ব্যতীত এবং স্থানীয়ভাবে বিপ্লবী সংগঠনের দুর্বল অস্তিত্ব থাকা মানে, এটি, বস্তুত, তা সন্ত্রাস মাত্রে পর্যবশিত হতে পারে।( Without a central body and with the weakness of local revolutionary organisations, this, in fact, is all that terror can be.)।
তিনি তৎকালীন তাদের সংগঠনের অবস্থার প্রেক্ষিতে ‘আক্রমণ হানো(To the assault)’ এই পন্থা ব্যবহারের পরিবর্তে ‘শত্রুর দুর্গকে ঘেরাও(Lay siege to the enemy fortress)‘ করার জন্য কর্মসূচি নিতে আহ্বান জানান। এরপরই তিনি লিখেন, পার্টির বিদ্যমান সমগ্র শক্তিকে এখনই আক্রমণের জন্য আহ্বান জানানো বর্তমান সময়ের করণীয় কর্তব্য হতে পারে না। কথায় নয় বরং কাজে বা বাস্তবে আন্দোলন পরিচালনায় সমর্থ এবং সকল শক্তিকে ঐক্যবদ্ধ করতে সমর্থ একটি বিপ্লবী সংগঠন গড়ে তোলার কাজ সম্পন্ন করা বর্তমান কর্তব্য হয়ে দাড়িয়েছে।
এরপর তিনি একটি প্রকাশনা বা প্রচারণামূলক পত্রিকার প্রয়োজনীয়তা কথা তোলেন। এই প্রকাশনার মাধ্যমে সারা রাশিয়ার নেটওয়ার্ক সৃষ্টি করা যাবে বলে মত দেন।
সর্বশেষে তিনি বলছেন,
আমরা নিরন্তরভাবে ধারাবাহিক ও পরিকল্পিত প্রস্তুতির কথা বলে আসছি। এবং এটা আমাদের চিন্তায় নেই যে  শুধুমাত্র নিয়মিত আঘাত অথবা সংগঠিত আক্রমণের মাধ্যমে স্বেচ্ছাচারীর পতন ঘটানো সম্ভব। এই ধরণের চিন্তা বা দৃষ্টিভঙ্গী হাস্যকর এবং গোঁড়ামীপূর্ণ।
অপরদিকে যথার্থতই এটা সম্ভব এবং ঐতিহাসিকভাবে অধিকতর সম্ভবপর যে, স্বেচ্ছাচার বা স্বৈরাচারিতার পতন হবে একটা স্বতস্ফূর্ত ঝাঁকুনি বা একটা অপ্রত্যাশিত রাজনৈতিক জটিলতার চাপে যা নিরন্তরভাবে প্রতিনিয়ত তাকে সকল দিক থেকে আশংকার মধ্যে রেখেছে।
তিনি আরো বলছেন,
কোনো রাজনৈতিক সংগঠনই জুয়াড়ীর মতো কোনো বিস্ফোরণ বা জটিলতা সৃষ্টির আশাকে ভিত্তি করে  তার কাজ চালাতে পারে না। যতই অপ্রত্যাশিত বা নিয়তি কিছুর উপর আমরা নির্ভরতা কমাতে পারবো ততই ‘ঐতিহাসিক মোড় ‘ ফেরানোর সময়ে আমরা অসচেতন বা অসাড় হয়ে কম থাকতে পারবো।
দ্রস্টব্য:  লেখাটি মার্ক্সিস্টস.অর্গ ওয়েবসাইট-এর Where to Begin? শীর্ষক লেনিনের লেখা থেকে সংক্ষেপ করে ভাবানুবাদ আকারে লেখা হয়েছে। পার্বত্য চট্টগ্রামকে প্রেক্ষিত বিবেচনা করে লেখার অবতাড়না করা হয়েছে।
অনুবাদে দুর্বলতা থাকা স্বাভাবিক।

Tuesday, March 24, 2015

লি কুয়ান ইয়ু- দায়বোধ সম্পন্ন, কর্তৃত্ববাদী স্বপ্নছোঁয়া একজন

সিঙ্গাপুর নামে এক ছোট দ্বীপখন্ড
800px-Singapore-overview
বেশ কয়েক দশক আগেও এই দ্বীপখন্ড ছিলো জেলেদের মাছ ধরার এক জনপদ। ১৮১৯ সালে ব্রিটিশরাজ এই অঞ্চলকে ব্যবসায়িক কলোনী হিসেবে ব্যবহারের উদ্যোগ গ্রহণ করেন। আয়তন ৭১৬ বর্গকিলোমিটারের(২৭৭ বর্গমাইল) কিছু বেশি। জনসংখ্যা বর্তমানে প্রায় ৫৫ লাখের মতো।জনপদে বসবাস করছেন মালয়ী-তামিল-চীনা এই তিন জাতির জনগণ। তবে প্রাপ্ত এক ডাটায় দেখা যায় সিঙ্গাপুরের মোট শ্রমশক্তির ৪৪ ভাগই বর্তমানে অন্য দেশ বা জাতি থেকে আগত।
১৯৪২ সালের দিকে জাপান এই অঞ্চল ব্রিটিশরাজ থেকে দখলে নেয়। ১৯৪৫ সালে জাপানের কাছ থেকে আবার তা ব্রিটিশদের হাতে চলে আসে। ১৯৫৫ সালে সিঙ্গাপুরকে স্বশাসনের অধিকার দেয়া হয়। ১৯৬৩ সালে এই্ অঞ্চলটি স্বেচ্ছায় মালয়েশিয়ার সাথে অঙ্গীভূত হয়। ১৯৬৫ সালের ০৯ আগস্ট এই অঞ্চল বিশ্বের আরেকটি স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে।
এরই মাঝে ১৯৫৪ সালে লি কুয়ান ইয়ু People’s Action Party (PAP) গঠন করেন। তিনি এই সংগঠনের প্রতিষ্ঠাতা সাধারণ সম্পাদক হন। ১৯৫৯ সালের নির্বাচনে তার দল সিঙ্গাপুরের ক্ষমতায় আসে। এবং তার নেতৃত্বেই সিঙ্গাপুর স্বাধীনতা লাভ করে। 
স্বপ্নছোঁয়া বাস্তববাদী লি কুয়ানের অগ্রাভিযান!
Lee kuan yew pictures10_0
১৯২৩ সালের ১৬ সেপ্টেম্বর তিনি চীনা এক পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। পারিবারিক নাম হ্যারী লি কুয়ান ইয়ু। সিঙ্গাপুরের ইংলিশ স্কুলে তিনি ভর্তি হন। সিঙ্গাপুরে জাপান ও ব্রিটিশরাজের মধ্যে যুদ্ধ শুরু হলে স্কুলে যাওয়া বন্ধ হয়। এরপর তিনি কিছুদিন জাপানী প্রচারণা বিভাগের একজন সদস্য হিসেবে নিজের ইংরিজী শেখা জ্ঞানকে কাজে লাগান।
এরপর তিনি লন্ডন স্কুল অব ইকোনমিকস প্রতিষ্ঠানে কিছুদিন লেখাপড়া করেন। পরে ক্যাম্ব্রিজে ভর্তি হন। সেখানে তিনি সমাজবাদী ভাবাদর্শ দ্বারা অনুপ্রাণিত হন। (তথ্যসূত্র: বিবিসি)
১৯৬৭ সাল। হাভার্ড ইউনিভার্সিটিতে বক্তব্যে তিনি ভিয়েতনাম যুদ্ধ ও তাতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকা নিয়ে বক্তব্য প্রদান করেন।  তার বক্তব্যটি এতটাই আকর্ষণীয় ছিল।  পরদিন ক্রিমসন ইউনিভার্সিটির প্রকাশিত সংবাদপত্রে বলা হয়েছিল, ‘নগররাষ্ট্র সিঙ্গাপুরের প্রধানমন্ত্রী লি কুয়ান ইউ একদিন শুধু তার দেশের নয়, বরং সমগ্র বিশ্বের গুটিকয়েক রাষ্ট্রনায়কের একজন হবেন, যারা অর্থনৈতিক উন্নয়নের মাধ্যমে স্বদেশের উন্নতি ঘটাতে পারবেন। তার উচ্চাকাঙ্ক্ষাই তাকে একজন শক্তিশালী আন্তর্জাতিক নেতা হিসেবে গড়ে তুলবে।‘ (তথ্য সৌজন্য: বণিক বার্তা)
১৯৫৯ থেকে ১৯৯০ প্রায় ৩১ বছর তিনি সিঙ্গাপুরের কর্তৃত্ববাদী প্রশাসক প্রধানমন্ত্রী হিসেবে সিঙ্গাপুর শাসন করেন। প্রধানমন্ত্রীত্ব থেকে অবসর নেবার পরও  তিনি সাধারণভাবে সংসদের একজন সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করে যান।
তিনি ক্ষমতায় থাকার সময় সিঙ্গাপুরকে বৈষয়িক অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির সোপান সীমায় নিয়ে যান। যে দেশ দারিদ্র্য প্রপিড়ীত এক দেশ হিসেবে বিবেচিত ছিল তিনি তার কর্তৃত্ববাদী শাসন শৃঙ্খলের দ্বারা তিনি সেই নগর সদৃশ সম্পনন্ন রাষ্ট্রকে সমৃদ্ধিসম্পন্ন উন্নত এক নগররাষ্ট্রে তার দেশকে পরিণত করেন। তাঁর বাস্তববাদীতার কারণে তিনি সম্মান ও মর্যাদা সমীহবোধ অর্জন করেছেন। কিন্তু তারপরেও তিনি বিতর্ক এড়িয়ে যেতে পারেননি। তার রাষ্ট্রে তিনি সংবাদ মাধ্যমের স্বাধীনতাকে স্বীকৃতি দেননি।
স্বাভাবিক বিচার প্রক্রিয়ার সুযোগ না দিয়ে তিনি তাঁর সমালোচনাকারীদের শাস্তি প্রদান করেছেন। তিনি দেশি-বিদেশী সংবাদ মাধ্যমের প্রকাশনা অবাধ করতে দেননি। তিনি অনেক সাংবাদিককে জেলে পুরেছেন। তিনি বলেছেন, সংবাদ মাধ্যমের স্বাধীনতা বা সংবাদ প্রকাশের স্বাধীনতাকে অবশ্যই সিঙ্গাপুরের একত্ববাদী চেতনার প্রয়োজনবোধের কাছে মাথা নিচু বা হেঁট করে রাখতে হবে। (“Freedom of the press, freedom of the news media, must be subordinated to the overriding needs of the integrity of Singapore,” he said.)
তিনি বলেছিলেন, সিঙ্গাপুরের অগ্রগতির স্বার্থে কিছু স্বাধীনতাকে বিসর্জন দিতে বা সমর্পন করতে হবে ।
সিঙ্গাপুরের অর্থনীতি
১৯৬৫ সালে সিঙ্গাপুরের অর্থনীতিতে জনপ্রতি জিডিপি ছিল ৫১১ আমেরিকান ডলার। বর্তমানে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৫৫১৮২ ডলারে।
১৯৬০ থেকে ১৯৮০ সালের মধ্যে জিএনপি বেড়েছে ১৫ গুণ।
হংকং এর পরে বিশ্বের মধ্যে এই দেশটিই সবথেকে উন্মুক্ত অর্থনৈতিক অঞ্চল হিসেবে বিবেচিত।
নিউজিল্যান্ড ও স্কান্ডিনেভিয়ান দেশের মত সবচেয়ে কম দুর্নীতিপিষ্ট দেশ হলো সিঙ্গাপুর। দেশের নেতা মন্ত্রীরা যেন দুর্নীতিতে না জড়ায় তার জন্য মন্ত্রীদের বেতন করেছিলেন ১০ লাখ ডলার।
এই দেশটি বিশ্বের ১৪তম বৃহত্তম রপ্তানীকারক দেশ এবং ১৫তম বৃহত্তম আমদানীকারক দেশ।
বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে দেশটি বিশ্বের ১১তম।
কিন্তু তারপরও এই দেশটি শ্রম শোষনমূলক দেশ অপেক্ষা অধিক কল্যাণমুখী দেশ হিসেবেও বিবেচিত হতে পারে হয়তোবা।
এই দেশটিতে ৫০ শতাংশ বা অর্ধেক জায়গা বৃক্ষ আচ্ছাদিত সবুজ গাছ গাছালিতে ভরা।  ছোটো এই দেশে ৫০টির অধিক পার্ক রয়েছে।
এই দেশের জনগণ আবাসন সুবিধা পেয়ে থাকে। সরকার এই অঞ্চলের জনগণে জন্য নিজ উদ্যোগে বাড়ি তৈরি করে দেয়।
স্বাস্থ্য সুবিধা নাগালের বাইরে নয়।
নেশা মাদকের হার কম।লি কুয়ান প্রধানমন্ত্রী থাকার সময় নিষিদ্ধ করেছিলেন জিউকবক্স, চুইংগাম ও প্লেবয় ম্যাগাজিন।
সেই লি কুয়ান ইয়ু মারা গেলেন । মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল ৯১ বছর । স্বাভাবিক বয়সেই তিনি মারা গেলেন। তার নিউমোনিয়া হয়েছিল। তাঁকে হাসপাতালে নেয়া হয়েছিল। হাসপাতালের বেডে তাঁর মৃত্যু হলো।
তিনি ছিলেন তামিল মালয় চাইনিজ ইংরেজি ভাষায় দক্ষ। তিনি একজন একনায়ক। তিনি কর্তৃত্ববাদী। তিনি আধুনিক সিঙ্গাপুরের রূপকার, আধুনিক সিঙ্গাপুরের জনক।তিনি কঠোর একজন প্রশাসক। তিনি ‘একজন বীর, তিনি একজন নেতা‘। তিনি ‘ইতিহাসের বিশাল ব্যক্তিত্ব‘। তিনি ‘ বহুল সম্মানিত পরিকল্পনাবিদ এবং রাষ্ট্রনেতা’। তিনি বিশ্ব রাজনীতির একজন ‘অভিভাবক’ । তিনি স্বপ্নপূরণকারী! তিনি স্বাপ্নিক। তিনি বাস্তববাদী। এভাবেই মৃত এই লি কুয়ানকে নানা অভিধায় সম্মানিত করেছন বিশ্বের নেতা-রাষ্ট্রনায়ক-জনগণ। 
কিন্তু তিনি যা বলেছেন তাই করেছেন, তাই তিনি বলেছেন,
 ‘আমি অত্যন্ত দৃঢ়প্রতিজ্ঞ মানুষ। আমি কোনোকিছু করার সিদ্ধান্ত নিলে, জীবন দিয়ে তা করার চেষ্টা করি। সারা দুনিয়া তার বিরুদ্ধে গেলেও আমি তা করে ছাড়ি। যদি আমার কাছে তা সঠিক মনে হয়। আমি মনে করি, এটাই নেতার কাজ।’ (তথ্য সৌজন্য: যুগান্তরডটকম।)

তিনি মানে লি কুয়ান ইয়ু ভগবানের বুকে পদচিহ্ন এঁকে দিয়েছন কী না তা ভবি’র হাতে রেখে দিলাম আমরা!

Thursday, September 11, 2014

মাও সেতুঙের ৩৮তম মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে সাজেকে আলোচনা সভা

সমাজতান্ত্রিক চীন গড়ার লড়াইয়ের সফল বিপ্লবী মাও সেতুঙের ৩৮তম মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে আজ ১০ সেপ্টেম্বর সকালে ইউপিডিএফ সাজেক ইউনিটের উদ্যোগে সাজেক ভূমিরক্ষা কমিটি কার্যালয়ে এক  আলোচনা সভার আয়োজন করা হয়। আলোচনা সভায় মাও সেতুঙের জীবন ও সংগ্রাম নিয়ে মূল আলোচনা করেন ইউপিডিএফ সাজেক ইউনিট সমন্বয়ক মিঠুন চাকমা। এছাড়া আলোচনায় অংশ নেন ইউপিডিএফ সদস্য ক্যহলাচিঙ মারমা, গণতান্ত্রিক যুবফোরাম সাজেক শাখার সহ সভাপতি জেনেল চাকমা।
মিঠুন চাকমা মাও সেতুঙ নিয়ে আলোচনার সময় বলেন, মাও সেতুঙ সঠিক রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি ও আদর্শকে আত্মস্থ করে চীনের লড়াই সংগ্রামকে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন। তিনি নিজের স্বার্থকে তুচ্ছ করে চীনের নিপীড়িত নির্যাতিত জনগণের মুক্তিকেই তার আসল লক্ষ্য র্নিধারণ করেছিলেন। প্রথম জীবনে তার লেখায় তিনি বলেছিলেন, বিপ্লবে সফল হতে হলে একজন ব্যক্তি শারীরিক পরিশ্রম করার সক্ষমতাও প্রয়োজন। তিনি ১৯২১ সালের কম্যুনিস্ট পার্টির কংগ্রেসে অংশগ্রহণ করার পর থেকে বিপ্লবী ধারার মার্ক্সবাদী লাইন গ্রহণ করেন। চীনের মতো বিশাল দেশকে মুক্ত করতে হলে শ্রমিক শ্রেনীকে সংগঠিত করার সাথে সাথে লক্ষ কোটি কৃষক শ্রেনীকে ঐক্যবদ্ধ করে সংগ্রাম করার উপর গুরুত্ব দেন। তিনি জনগণের কল্যাণ ও তাদের মুক্তিকেই সংগ্রামের আসল লক্ষ্য নির্ধারণ করেছিলেন। জনগণের মুক্তির নাম দিয়ে জনগনের উপর অত্যাচার নিপীড়ন খবরদারী করার নীতি তিনি ও চীনা কম্যুনিস্ট পার্টি গ্রহণ করেনি।
পার্বত্য চট্টগ্রামের লড়াই সংগ্রামের বর্তমান অধ্যায়ে যে রাজনৈতিক দিশাহীন আত্মঘাতি ভ্রাতৃঘাতি হানাহানি লক্ষ্য করা যাচ্ছে তা থেকে মুক্ত হবার জন্য সঠিক পথ খুজে পেতে মাও সেতুঙ ও তার সংগ্রামকে অধ্যয়ন করা প্রত্যেক বিপ্লবীর অবশ্য করণীয় কর্তব্য বলে তিনি আলোচনা সভায় উল্লেখ করেন।
তিনি বলেন, মা সেতুঙ বলেছেন, রাজনৈতিক সংগ্রামে বিজয়ী হওয়া বা পরাজিত হওয়ার ক্ষেত্রে ’আদর্শগত এবং রাজনৈতিক লাইনের সঠিকতা বা বেঠিকতাই সবকিছু নির্ধারণ করে।’ তাই মতাদর্শগত লড়াই এগিয়ে নেয়া আন্দোলনকারীদের প্রধান কর্তব্য হওয়া প্রয়োজন। তিনি সঠিক রাজনৈতিক লাইন ও দর্শনকে আত্মস্থ করা সম্ভব হলে পার্বত্য চট্টগ্রামের জাতিসত্তার অধিকার আদায়ের সংগ্রাম সঠিক দিশা পাবে বলে।
তিনি বলেন, মাও সেতুঙ যখন সংগ্রাম করেছিলেন তখন তিনি শুধুমাত্র ’শত্রুবাহিনীর বিরুদ্ধে যুদ্ধ’ করেননি। এছাড়া তিনি জনগণের উৎপাদন, শিক্ষা, চিকিৎসা, যোগাযোগ, যাতায়াত ব্যবস্থার উন্নয়ন সাধনের জন্য পার্টির সদস্যদের উদ্বুদ্ধ করেছিলেন। ফলে তিনি ব্যাপক চীন জনগণের সমর্থন লাভ করেন এবং সংগ্রামে বিজয় অর্জন করেন। পার্বত্য চট্টগ্রামের লড়াই সংগ্রামের ক্ষেত্রেও পার্টির সদস্যদের জনগণের সকল সমস্যার দিকে খেয়াল রেখে তা নিরসনের উদ্যোগ নিতে হবে।
উল্লেখ্য চীন বিপ্লবের নেতা মাও সেতুঙ ১৮৯৩ সালে হুনানের শাওশানে এক দরিদ্র কৃষক পরিবাে জন্মগ্রহণ করেন। তার নেতৃত্বে চীন গণপ্রজাতনন্ত্র গঠিত হয়। বিপ্লবের পরে তিনি চীনকে স্বনির্ভর করতে গ্রেট লিফ ফরোয়ার্ড আন্দোলনের মাধ্যমে চীনকে শিল্প ও কৃষিতে উন্নত দেশ হিসেবে গড়ে তুলেন। শেষ বয়সে তিনি মহান সর্বহারা সাংস্কৃতিক বিপ্লবের ডাক দেন।
১৯৭৬ সালের ০৯ সেপ্টেম্বর তিনি বেইজিঙে মৃত্যুবরণ করেন।

Friday, June 13, 2014

কার্ল মার্কসের জীবন ও দর্শন নিয়ে আলোচনা প্রসঙ্গে আমার একান্ত ব্যক্তিগত মতামত

কার্ল মার্ক্স কে নিয়ে শুধু তার জন্মমৃত্যু দিবসকে নিয়ে আলোচনা করে যদি আমরা ক্ষান্ত থাকি তবে আসলে আমরা তাকেই অপমানিত করছি! আর তার জন্মদিনে যদি আমরা শুধু তার কীর্তিকলাপ নিয়েও আলোচনা করি তবে তবুও আমরা তাকে বা তার দর্শনকে অপমানিত করছি! তাহলে আমরা তাকে নিয়ে বা এই ধরণের আজন্ম বিপ্লবীদের নিয়ে আলোচনা করতে গেলে কী নিয়ে আলোচনা করব?

আমাদের কার্ল মার্ক্সকে নিয়ে আলোচনা করতে হবে বিপ্লব বা সংগ্রামের লাইনের সঠিক দৃষ্টিভঙ্গি আয়ত্ত করার জন্য। শুধুমাত্র তার জন্মমৃত্যুর তারিখ বা কোনদিন তিনি কোন বই লিখেছেন বা কী কাজ করেছেন বা কী ভালো ভালো কথা বলেছেন কী ভালো ভালো কাজ করেছেন তার  আদ্যপান্ত মুখস্থ করে তা দর্শক শ্রোতাদের কাছে বলে তার জন্মমৃত্যু দিবস পালন করে আমাদের ক্ষান্ত বা সন্তুষ্ট থাকলে হবে না। বরঞ্চ তিনি তার সময়ে বিপ্লবী কাজ করার সময় বিপ্লবের তাত্ত্বিক কী দিশা প্রদান করেছিলেন এবং তা সমসাময়িক সময়ের প্রেক্ষিতে সঠিক ছিলো কিনা বা তিনি সংগ্রামের লাইন সম্পর্কে কী তাত্ত্বিক ও বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিভঙ্গি প্রদান করেছিলেন তা নিয়ে আমরা আলোচনা করে বর্তমান সময়ে সেই তত্ত্বের দৃষ্টিভঙ্গির প্রাসঙ্গিকতা নিয়ে আলোচনা করলেই তবে আমাদের কার্ল মার্ক্সকে নিয়ে আলোচনা সার্থক হবে বলে প্রতীয়মান হয়।

কার্ল মার্ক্স। পুরো নাম । তিনি ১৮৮১ সালের  ৫মে জন্মগ্রহণ করেন। জন্সস্থান প্রুশিয়া (বর্তমানে জার্মান)’র রাইন শহরের ত্রিয়ার শহরে। তার পিতা ইহুদী এডভোকেট নাম:হাইনরিশ মার্ক্স । মায়ের নাম হেনরিয়েটা নি’ প্রেসবুর্গ। তিনি তার পিতামাতার ৯ জন সন্তানের মধ্যে ৩য়। তার প্রাথমিক শিক্ষার পাঠ শুরু হয় ত্রিয়ার শহরের এক স্কুলে।

কার্ল মার্ক্সের শিক্ষাজীবন নিয়ে উইকিপিডিয়ায় যা লেখা হয়েছে তা নিচে তুলে ধরছি-

র্কাল র্মাক্স ১৩ বছর বয়স র্পযন্ত বাড়িতেই পড়াশুনা করেন। বাল্যকালে বাড়িতে লেখাপড়া শেষ করে  তিনি ত্রিয়ার জিমনেসিয়ামে র্ভতি হন। ১৭ বছর বয়সে সেখান থেকে স্নাতক ডিগ্রি লাভ করেন। এরপর ইউনিভার্সিটি অফ বন-এ আইন বিষয়ে পড়াশোনা শুরু করনে। তার ইচ্ছা ছিলো তিনি সাহিত্য ও দর্শন নিয়ে পড়বেন , কিন্তু তার বাবা মনে করতেন কার্ল স্কলার হিসেবে নিজেকে প্রস্তুত করতে পারবে না। কিছুদিনের মধ্যইে তার বাবা তাকে বার্লিনের হুমবোল্ডট ইউনিভার্সিটিতে বদলিকরিয়ে দেন। সে সময় র্মাক্স জীবন নযি়ে কবতিা ও প্রবন্ধ লখিতনে, তার লখোর ভাষা ছলি বাবার কাছ থকেে পাওয়া র্ধমতাত্ত্বকি তথা অতর্বিতী ঈশ্বরবাদরে ভাষা। এ সময়ই তরুণ হগেলেযি়ানদরে নাস্তকিতাবাদ গ্রহণ করনে। ১৮৪১ সালে পএিইচডি ডগ্রিি লাভ করনে। তার পএিইচডি অভসির্ন্দভরে বষিয় ছলি "ঞযব উরভভবৎবহপব ইবঃবিবহ ঃযব উবসড়পৎরঃবধহ ধহফ ঊঢ়রপঁৎবধহ চযরষড়ংড়ঢ়যু ড়ভ ঘধঃঁৎব" (প্রকৃতি সম্বন্ধে দমেোক্রতিোসীয় ও এপকিুরোসীয় র্দশনরে মধ্যে র্পাথক্য)।
তথ্যসূত্র: উইকিপিডিয়া.কম

১৮৪৩ সালে তিনি জেনিফন ভেস্টফালেনকে বিয়ে করেন। ভেস্টফালেন ছিলেন অভিজাত পরিবারের মেয়ে। কিন্তু মার্ক্সকে বিয়ে করার পরে তিনি সারাজীবন মার্ক্সের সর্বহারা দার্শনিক মতবাদের সাথে অঙ্গাঙ্গি জড়িত হয়ে পড়েন। ১৮৪৩ সালের ১৯ জুন তাদের মধ্যে বিয়ে হয়।

১৮৪৩ সালের অক্টোবরের শেষদিকে তিনি প্যারিসে আসেন। এসময় ফ্রান্সের প্যারিস ছিলো ব্রিটিশ, পোলীয় ও ইতালীয় বিপ্লবীদের সদরদপ্তর। তিনিও বিপ্লবী সংগঠনের সাথে যুক্ত হয়ে পড়েন। ১৮৪৪ সালের সেপ্টেম্বরে ফ্রেডরিক এঙ্গেলসের সাথে তার দেখা হয়। এবং তারপর থেকে তাদের মধ্যে যে বৃদ্ধিবৃত্তিক আত্মিক বন্ধুত্ব শেষজীবন পর্যন্ত অটুট ছিলো তা এখনো বৌদ্ধিক বন্ধুত্বের সর্বশ্রেষ্ঠ নিদর্শন হয়েই রয়েছে।

প্যারিসে থাকার সময় তিনি লীগ অব জাস্ট নামক গোপন সংগঠনের পত্রিকায় লেখালেখি করেন। তিনি ইহুদী প্রশ্ন ও হেগেল সম্পর্কে এসব লেখা লিখেন। এছাড়া তিনি ফরাসী বিপ্লব ও প্রুধোর দার্শনিক মতবাদ নিয়েও এসময় পড়াশুনা করেন।

১৮৪৫ সালে ফরাসী সরকার তাকে তাদের দেশ থেকে বহিষ্কার করলে তিনি বেলজিয়ামের রাজধানী ব্রাসেলসে চলে যান। সেখানে তিনি বস্তুবাদের ইতিহাস বিষয়ে ধারণা গ্রহণ করতে পড়াশুনা করেন। সেখানে চরম অর্থকষ্টে ভুগলে ফ্রেডরিখ এঙ্গেলস তাকে সহায়তা করেন।

প্যারিসে এবং ব্রাসেলসে তিনি যে পড়াশুনা করেন এবং যে অভিজ্ঞতার ঝুলি তিনি সংগ্রহ করেন তার মাধ্যমে তিনি তার সমাজবিকাশ সংক্রান্ত ঐতিহাসিক বস্তুবাদী দৃষ্টিভঙ্গিকে  আরো পোক্ত করে তোলেন।

১৮৪৭ সালে তিনি কমিউনিস্ট লীগে যোগদান করেন। কমিউনিস্ট লীগের দ্বিতীয় কংগ্রেস অনুষ্ঠিত হয় ঐ বছরের নভেম্বরে। তাকে সংগঠনের ইশতেহার রচনার দায়িত্ব দেয়া হলে তিনি ঐতিহাসিক ’কমিউনিস্ট ইশতেহার’ রচনা করেন। তিনি উক্ত রচনার নাম দিয়েছিলেন ’কমিউনিজমের মূলসূত্র”। পওে এঙ্গেলসকে তা দেখালে তিনি উক্ত রচনার নাম বদল করে ’কমিউনিস্ট ইশতেহার’ নামটি দেয়ার প্রস্তাব করেন। কার্ল মার্ক্স এই এঙ্গেলসের প্রস্তাব মেনে নেন।

মার্ক্সস ব্রাসেলসে অবস্থান করার সময় ১৮৪৮ সালের দিকে অস্ট্রিয়ায় আন্দোলন ছড়িয়ে পড়ে(কী আন্দোলন?)। এই আন্দোলনের ঢেউ বার্লিন, বেলজিয়া, ফ্রান্সসহ সারাদেশে ছড়িয়ে পড়ে। আন্দোলনের সাথে জড়িত থাকা ও লেখালেখির কারণে তিনি এবার আবার বেলজিয়াম থেকে বহিস্কৃত হন। সেখান থেকে তিনি ফ্রান্সের তৎকালীন বিপ্লবীদের আমন্ত্রণে প্যারিসে গমন করেন। ১৮৪৯ সালে তিনি জার্মানীর কোলনে ফিওে যান। সেখানে তিনি নভো রাইনিশ চাইটুঙ নামে একটি পত্রিকা প্রকাশের উদ্যোগ নেন। পত্রিকায় সশস্ত্র সংগ্রাম ইত্যাদি বিষয়ে লেখালেখি করার কারণে জার্মান সরকার তাকে বহিস্কার করে। এরপর তিনি ফ্রান্সে রাজনৈতিক আশ্রয়লাভের চেষ্টা করে ব্যর্থ হন। অবশেষে তিনি লন্ডনে চলে যান। তিনি সেখানে বহুবছর স্থায়ীভাবে বসবাস করেন। ১৮৫১ সাল থেকে তিনি আমেরিকার ’নিউ ইয়র্ক ট্রিবিউন’-এর প্রতিনিধি হিসেবে লেখালেখি করেন। লন্ডনে থেকেই তিনি দ্য ক্যাপিটাল রচনায় হাত দেন।
কার্ল মার্কসের জীবন  ও সংগ্রাম থেকে কী শিক্ষা নিতে পারি

১৮৪৮ সালে অস্ট্রিয়ায় বিভিন্ন জাতিসর্মহের সংগ্রাম ও সেখান থেকে কার্ল মার্ক্সের শিক্ষা

ক) বিপ্লব আমদানী বা রপ্তানী করা যায় না।

খ) নিপীড়িত জাতিসমূহ নিজেরা মুক্ত হতে পারে কেবলমাত্র অন্য জাতির মুক্তি আন্দোলনের সাথে একাত্মতা হবার মাধ্যমে

১৮৪৮ সালে অস্ট্রিয়ায় হাঙ্গেরীয়, পোলিশ, চেক, ইতালীয় জাতিসমূহের সংগ্রাম শুরু হয়। এই সংগ্রাম গোটা ইউরোপে ছড়িয়ে পড়ে। এই সংগ্রামে তিনি নিপীড়িত জাতিসমূহের পক্ষে অবস্থান নেন। এবং সংগ্রামকে কাছে থেকে নিবিড় পর্যবেক্ষণ করতে থাকেন। এ সময় তিনি কিছুদিন প্যারিসে থাকাকালীন জার্মানীতে বিপ্লব সংঘটনের ক্ষেত্রে ’বিপ্লব আমদানী বা রপ্তানীর হঠকারীতা বিষয়ে প্যারিসে অবস্থানরত জার্মান বিপ্লবীদের সতর্ক করেন। জার্মান দেশটি তখন ছিলো খন্ড বিখন্ড। হস্তশিল্পীদের অধিক্য ছিলো।
তিনি বললেন, একটি জাতি যুগপৎ মুক্তি অর্জন ও অন্য জাতিসমূহকে নিপীড়ন নির্যাতন করতে পারে না। জার্মানীর মুক্তি অর্জিত হবে না যদি পোল্যান্ডের জনগণ জার্মানীর নিপীড়ন থেকে মুক্তি অর্জন না করে।
অর্থাৎ নিপীড়িত শ্রেনীর মুক্তি সম্ভব নিপীড়িত জাতির মুক্তি সংগ্রামকে সমর্থন ও সহযোগিতা দিয়ে।

A nation cannot become free and at the same time continue to oppress other nations. The liberation of Germany cannot therefore take place without the liberation of Poland from German oppression.

Engels, Speech on Poland (1847)


গ) ইউটোপিয় সমাজতন্ত্র ও সংকীর্ণতার বিরুদ্ধে

অরি সা সিমো ও রবার্ট ওয়েন ইউটোপীয় সমাজতন্ত্রের কথা বলতেন। সমাজ বিকাশের সাথে সম্পৃক্ত মৌলিক উপাদান তথা প্রভাবক শক্তি উৎপাদনের মালিকানা, উৎপাদনের উপায় ও উৎপাদিকা শক্তি সমূহ ও শ্রেনীব্যবস্থাকে স্বীকার না করে তারা নিজেদের মনগড়া ’সৎ’ দৃষ্টিভঙ্গির মাধ্যমে সমাজ পরিবর্তনের চিন্তা করতেন। শুধুমাত্র সৎ থেকে বা সমাজের জন্য ভালো কিছু করার আকাঙ্খা থেকে যে সমাজ পরিবর্তন সম্ভব নয় তা তারা বুঝতেন না। সম্জা পরিবর্তন করতে হলে সঠিক দার্শনিক তত্ত্বকে আয়ত্ত করার দিকে তারা নজর দিতেন না।
তারা বিশ্বাস করতেন ’কয়েকজনে মিলে ’ শ্রমিক শ্রেনীর মাঝে ’সাম্যাবস্থা’ চালু করলেই ’সমাজতন্ত্র’ বা সাম্যবাদ কায়েম হবে। কিন্তু সমাজতন্ত্র কায়েম করতে হলে প্রয়োজন সঠিক দার্শনিক দৃষ্টিভঙ্গিসম্পন্ন রাজনৈতিক সংগ্রামের যে প্রয়োজন তা তারা অস্বীকার করতেন। তারা ট্রেড ইউনিয়ন সংগঠন, ধর্মঘট ও রাজনৈতিক লড়াইয়ের বিরোধিতা করতেন।
জার্মান দর্জি ভিলহেলম ভাইটলিং তিনিও সমাজতন্ত্রে বিশ্বাস করতেন। কিন্তু তার দৃষ্টিভঙ্গি চিলো লুম্পেন প্রলেতারিয়েতের।
আরো এক ধরণের সমাজতান্ত্রিক তখন ছিলেন যারা সমাজে প্রেম ও ভ্রাতৃত্ববোধের বাণী প্রচার করতেন। তারা মনে করতেন শ্রমিক ও মালিক শ্রেনীর মধ্যে প্রেম ও ভ্রাতৃত্ববোধের বন্ধন সৃষ্টি হলেই যে সমাজে ’সমাজতন্ত্র’ এসে যাবে। এই সকল ভুল দার্শনিক দৃষ্টিভঙ্গিও বিরুদ্ধেও তিনি দাড়িয়েছিলেন।

ভুল দৃষ্টিভঙ্গির বিরুদ্ধে দার্শনিক সংগ্রাম

ঘ) দার্শনিকদের দায়িত্ব
দার্শনিক এতদিন শুধু জগতের ব্যাখ্যা মাত্র দিয়ে আসছেন। কিন্তু জগতকে যে পরিবর্তন করতে করতে সমাজ অগ্রসর হচ্ছে তা বলা হয়নি। তিনি লেখেন, এ যাবৎ দার্শনিকরা ভিন্ন ভিন্ন রূপে জগতের ব্যাখ্যা দিয়েছেন। কিন্তু ব্যাপারটা হলো- তাকে পরিবর্তন করতে হবে।
The philosophers have only interpreted the world, in various ways; the point is to change it.

Marx, Theses On Feuerbach: Thesis 11 (1845)

তথ্যসূত্র: মার্ক্সিস্টস.অর্গ

ঙ) সংগ্রামের ইতিহাস রচয়িতা কারা?

ব্রুনো বাউয়ের নামে এক দার্শনিক বললেন- বাছা বাছা কয়েকজনই ইতিহাস রচনা করেন। ছোট এই দৃষ্টিভঙ্গি শ্রেনী সমাজ ও জাতির আন্দোলনের ইতিহাসকে বিভ্রান্ত করে দিতেই যথেষ্ট। কার্ল মার্ক্স এই ভুল তাত্ত্বিক দৃষ্টিভঙ্গির বিরুদ্ধে সংগ্রাম করলেন। তিনি বললেন জনগণই ইতিহাস রচনা করে।
History does nothing, it ‘possesses no immense wealth’, it ‘wages no battles’. It is man, real, living man who does all that, who possesses and fights; ‘history’ is not, as it were, a person apart, using man as a means to achieve its own aims; history is nothing but the activity of man pursuing his aims..

Marx, The Holy Family, Chapter 6 (1846)


চ) সমাজ তথা মানুষ ও প্রকৃতির ইতিহাস পরষ্পর অবিচ্ছিন্ন

ইতিহাস রচনার ক্ষেত্রে দেখা যায় মানুষের বা সমাজের ইতিহাস থেকে প্রকৃতির ইতিহাসকে  বা প্রকৃতির ইতিহাস থেকে সমাজের বিকাশের ইতিহাসকে বিচ্ছিন্নভাবে দেখা হয়। কিন্তু কার্ল মার্ক্স এই দৃষ্টিভঙ্গিও বিরোধীতা করে বললেন- আমরা কেবল একটি বিজ্ঞানের কথাই জানি, তা হলো ইতিহাসের বিজ্ঞান। ইতিহাসকে অন্যকেউ দুইভাবে দেখতে পারে। অর্থাৎ তারা ইতিহাসকে প্রকৃতির ইতিহাস ও মানুষের ইতিহাস এই দুইভাগে ভাগ করতে পারে। কিন্তু তারা আদতেই অবিচ্ছিন্ন বা একাঙ্গিভূত। যতদিন মানুষের অস্তিত্ব থাকবে ততদিন প্রকৃতি ও মানুষের ইতিহার পরষ্পর নির্ভরশীল হয়ে থাকবে।
ফয়েরবাখের তাত্ত্বিক ভ্রান্তির বিরুদ্ধে দাড়িয়ে তিনি এই কথা বলেন। ফয়েরবাখ মানুষ ও সমাজের ইতিহাসকে প্রকৃতি থেকে বিচ্ছিন্ন করার কারনে প্রকৃতির বিরুদ্ধে সংগ্রাম করে যে মানুষের সমাজের বিকাশ সাধান হয়েছে তা অস্বীকার করেছিলেন।
We know only a single science, the science of history. One can look at history from two sides and divide it into the history of nature and the history of men. The two sides are, however, inseparable; the history of nature and the history of men are dependent on each other so long as men exist.
Marx, German Ideology (1845)

ছ) দর্শনের দারিদ্র্য

প্রুধো নামের এক দার্শনিক লিখেছিলেন দারিদ্রের দর্শন। কার্ল মার্ক্স তার বিপরীতে লিখলেন ’দর্শনের দারিদ্র্য’। প্রুধো পুজির মন্দ ভালো বেছে নেয়ার কথা বলেছিলেন। তিনি মুদ্রা ছাড়া পণ্য বিনিময় করার মাধ্যমে পুজিবাদের সংকট দূর করা যাবে বলে মত দিয়েছিলেন। তিনি শ্রেনী ব্যবস্থাকে অপরিবর্তনীয় মনে করতেন।
এখানে কার্ল মার্কস দর্শন বা দৃষ্টিভঙ্গিগত বিষয়ের প্রতি জোর দিয়ে আলোচনা এগিয়ে নিতে চেয়েছেন। তিনি সমাজের মধ্যে শ্রেনী বিভেদ ও দারিদ্র্যকে পরিবর্তনীয় বলে মত দিয়েছেন।

রাজনীতি ও অর্থনীতি বা রাজনৈতিক লড়াই ও অর্থনৈতিক ব্যবস্থা পরষ্পর সম্পৃক্ত
১৮৭১ সালে ফ্রান্সের বিপ্লব ও প্যারি কমিউন গঠন। এই অভিজ্ঞতা থেকে তিনি বুঝতে পারেন যে শুধুমাত্র রাজনৈতিক লড়াইয়ের মাধ্যমে শ্রমিক সমাজের অধিকার আদায় বা সমাজতন্ত্র কায়েম সম্ভব নয়। রাজনৈতিক লড়াইকে বুঝতে হলে অর্থনীতি বা অর্থনৈতিক ব্যবস্থাকে বুঝতে হবে। এরপরই তিনি ব্রিটেনের জাতীয় জাদুঘর ও লাইব্রেরিতে অর্থনৈতিক বিধিব্যবস্থা বিষয়ে পড়াশুনা করেন।

রাজতৈনিক লড়াইকে এগিয়ে নিতে হলে অর্থনৈতিক ব্যবস্থাকেও যে বুঝতে হয় এ বিষয়ে তিনি জীবনের শেষ পর্যন্ত অধ্যয়ন করেছিলেন।

সংক্ষেপে কার্ল মার্কসের উপরের এই তাত্ত্বিক দৃষ্টিভঙ্গিসমূহ বোঝা বা জানার মাধ্যমে বর্তমান প্রেক্ষাপটে তার যথোপযুক্ত ব্যবহার করেই আমরা কার্ল মার্কসের মতবাদকে সার্থক রূপায়ন করতে পারি বলেই আমার  মনেহয়।
(উপরের বক্তব্য বা বিষয়বস্তু বিষয়ক মতামত একান্তই নিজস্ব। এবং পার্বত্য চট্টগ্রাম প্রেক্ষিত বিবেচনা করে আমি উক্ত বক্তব্য প্রদান করেছি। ধন্যবাদ)

Sunday, November 10, 2013

ফেসবুক সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের সৃষ্টিকারী মার্ক জুকারবার্গ ও তার জীবনবোধ

 মার্ক জুকারবার্গ। পুরো নাম মার্ক এলিয়ট জুকারবার্গ(Mark Elliot Zuckerberg)। জন্মেছিলেন আমেরিকা বা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে।বর্তমানে তিনি বিশ্বে বহুলভাবে পরিচিতদের মাঝে একটি অন্যতম নাম। তিনি ইন্টারনেটের সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকের(Facebook.com) প্রতিষ্ঠাতা। তার বয়স তেমন বেশি নয়। জন্মেছিলেন ১৯৮৪ সালের ১৪ মে। ২০১৩ সালের শেষে এসে তার বয়স মাত্র ২৮ বছর(+)।
তিনি ২০১৩ সালের এপ্রিলে ফেসবুক কোম্পানীর চেয়ারপারসন এবং প্রধান কার্যনির্বাহী হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছেন। সেপ্টেম্বর ২০১৩ সাল পর্যন্ত প্রাপ্ত হিসাবমতে তার সম্পদের পরিমাণ এখন ১৯ বিলিয়ন মার্কিন ডলার।( সূত্র: উইকিপিডিয়া)। 

বর্তমানে বিশ্বে ফেসবুক ব্যবহারকারী ১২০ কোটির উপরে। ইন্টারনেটের আর কোনো সামাজিক মাধ্যম এত মানুষের কাছে পৌঁছাতে পারেনি। অথচ, এই  ফেসবুকের যখন প্রথম শুরু হয়েছিল তখন শুধুমাত্র সীমাবদ্ধ ছিলো হার্ভার্ড ইউনিভার্সিটি কেন্দ্রীক। তখন হার্ভাডের ছাত্র-ছাত্রীরাই শুধু এটির ব্যবহার করতেন। প্রথমদিকে নাম ছিলো "দ্য ফটো এড্রেস বুক"। এটি ছিলো অনেকটা 'স্টুডেন্টস ডাইরেক্টরি'র মতো।এতে ছাত্র-ছাত্রীরা তাদের নাম, ফোন নাম্বার, তাদের বন্ধুদের নাম, পাঠরত বিভাগের নাম ইত্যাদি লিখে রাখতে পারতেন।

ছাত্র-ছাত্রীরা এর নাম রেখেছিলো 'দ্য ফেসবুক'।এবং পরে 'দ্য' বাদ দিয়ে এর নাম হয়ে যায় "ফেসবুক"।

সময়টা ছিলো ২০০৪ সালের ফেব্রুয়ারি মাস। হার্ভাডের এক ডরমিটরীতে তিনি প্রথম ফেসবুক প্রতিষ্ঠা করেন। পরে যখন ফেসবুক অন্য শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ছাত্র-ছাত্রীদের মাঝেও ছড়িয়ে দেয়া হয় তখন ক্যালিফোর্নিয়ার পালো আলটোতে ফেসবুকের অফিস স্থানান্তর করা হয়।
এবং তারপর থেকে ফেসবুকের ইতিহাস বিজেতার ইতিহাস, স্রাফল্যযুক্ত ধাবমানতার ইতিহাস! এ যেন আসলাম, দেখলাম, জয় করলাম এমন একটি ভাব!

২০০৭ মালের মধ্যে জুকারবার্গ আর্থিক বিত্তের পরিমাপে পরিগণিত হয়ে যান "বিলিয়নেয়ারে"। 
২০১০ সালে টাইম ম্যাগাজিনের দৃষ্টিতে তিনি বিশ্বের প্রভাবশালী এবং অর্থবিত্তসম্পন্ন ১০০ জনের মধ্যে নিজের স্থান করে নেন। 
দ্য জেরুজালেম পোস্টের দৃষ্টিতে তিনি ২০১১ সাল থেকে ২০১৩ সাল পর্যন্ত অর্থাৎ এখন পর্যন্ত অভিহিত হয়েছেন - Most Influential Jews in the World হিসেবে। 

না, আমি আজ জুকারবার্গের জীবনী নিয়ে বা তার সাফল্য নিয়ে কথা বলতে বসিনি। কিন্তু তার জীবনের উত্থান বিষয়ে না বললে যেন তাকে নিয়ে কথা শুরু করা যায় না। তাই এত কথা বলা...

আমি আজ জুকারবার্গের জীবন দর্শন নিয়ে কিছু কথা শেয়ার করতে চাইছি।  

বিশ্বকে অবাধ ও উন্মুক্ত করার আকাঙ্খা

 ২০১২ সালেন ফেব্রুয়ারি প্রদত্ত এক বার্তায় তিনি বলেন-
Facebook was not originally created to be a company. It was built to accomplish a social mission — to make the world more open and connected.

অর্থাৎ, তিনি বলতে চেয়েছেন, ফেসবুক আদি থেকে কোম্পানী হিসেবে সৃষ্টি হবার জন্য গঠিত হয়নি। একটি সামাজিক লক্ষ্য উদ্দেশ্যকে কাজে প্রতিফলিত করার জন্যই তাকে গঠন করা হয়েছিলো।  এবং এই লক্ষ্য হচ্ছে, পৃথিবী বা বিশ্বকে আরো অবাধ উন্মুক্ত করা ও কানেক্টেড বা পারষ্পরিক যোগাযোগ বৃদ্ধি করা।

২০১০ সালে Wired নামক ম্যাগাজিনে প্রদত্ত এক সাক্ষাতকারে তিনি বলেছিলেন-
The thing I really care about is the mission, making the world open
তিনি আরো বলছেন, বিশ্বের প্রত্যেকজনকে যোগাযোগের মধ্যে বা পারষ্পরিক কাছাকাছি নিয়ে আসার একটি সম্ভাবনা এবং সৃষ্টি হয়েছে এবং তার প্রয়োজনও অপরিসীম। সমাজকে ভবিষ্যতের জন্য রূপান্তর করতে এবং প্রত্যেকের কন্ঠ বা ভাব প্রকাশের সুযোগ উপস্থিত হয়েছে। 

মিশন বা লক্ষ্য অনেক বৃহৎ, কিন্তু তার শুরুর পদক্ষেপ ছোট
তিনি তার বার্তা বা চিঠিতে বলেছেন-
Even if our mission sounds big, it starts small — with the relationship between two people.
অর্থাৎ, যদিও লক্ষ্যকে অনেক বৃহৎ বলে প্রতীয়মান হয়, কিন্তু তার শুরুর পদক্ষেপটা ছোট। দুইজনের মধ্যে পারষ্পরিক যোগাযোগ হতে তার শুরু।

অর্থবিত্ত বানাতে  নয়, ভালো সেবা প্রদানের মাধ্যমে অর্থ আয়ই লক্ষ্য
তিনি বলছেন-
Simply put: we don't build services to make money; we make money to build better services.
ফেসবুক ইন্ক বা ফেসবুক কোম্পানী অবশ্যই একটি ব্যবসা প্রতিষ্ঠান। কিন্তু তা অর্থবিত্ত করার জন্য নয়, বরং ভালো মানের সেবা প্রদানের মাধ্যমে অর্থবিত্ত করাই তার লক্ষ্য। 
তিনি বলছেন- 
 We've always cared primarily about our social mission, the services we're building and the people who use them. 
অর্থাৎ,সামাজিক লক্ষ্য বা মিশনকে প্রাথমিক লক্ষ্য হিসেবে ধরেই সেবার উদযোগ নেয়া হয়।
 ফেসবুক লুটপাটের যন্ত্র যে নয় তা বোঝা যায়! 
 জুকার বার্গের জীবন কাটে সাদামাটাভাবে
Mark Zuckerberg leads a fairly low-key life in California, where he lives with his girlfriend in rented accommodation within walking distance of the Facebook headquarters.

courtesy: the telegraph
মার্ক জুকার বার্গের জীবন কাটে খুবই সাদামাটাভাবে তার জীবন সঙ্গীনির সাথে ক্যালিফোর্নিয়ায় ফেসবুক অফিস থেকে হাঁটা পথের দুরত্বে।

হ্যাকার ওয়ে(Hacker Way)
সাধারন্যে বা গণমাধ্যমে 'হ্যাকার' এর মানে নেতি অর্থে ধরা হয়। এর মানে কম্পিউটার যোগাযোগ ভঙ্গ করা(The word "hacker" has an unfairly negative connotation from being portrayed in the media as people who break into computers.)। 
 কিন্তু জুকার বার্গ 'হ্যাকার ওয়ে' শব্দবন্ধটিকে ইতি অর্থেই ব্যবহারে উদ্যোগ নিচ্ছেন। 
জুকার বার্গের ভাষায়- 
Hackers believe that the best idea and implementation should always win — not the person who is best at lobbying for an idea or the person who manages the most people.

এর মানে করলে দাঁড়ায়, কোনো উত্তম  আইডিয়া বা চিন্তাকে অবশ্যই জিতে আসতে হবে। তা(উত্তম আইডিয়া বা চিন্তা) কারো একার বা কোনো একাধিপত্যকামীর নিয়ন্ত্রনাধীন বা মনমেজাজ বা দয়ার উপর নির্ভরশীল হবে না।

Done is better than perfect


নিখুঁত কাজ প্রয়োজনীয়। কিন্তু জুকারবার্গ বলছেন-  শতভাগ নিখঁত কাজের চেয়ে কাজটিকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়াই মুখ্য। ফেসবুক কোম্পানী তাদের অফিসের দেয়ালে টাঙিয়ে রেখেছে- Done is better than perfect এই বক্তব্যটি
শতভাগ নিখুঁত কিন্তু অসমাপ্ত কাজের চেয়ে কিছু ভুলত্রুটিসহ একটি সমাপ্ত কাজ অধিক গুরুত্বপূর্ণ।(সূত্র: দৈনিক প্রথম আলো)
পাকাপাকিভাবে কোনো কাজ সমাপ্ত করা যাবে না। একটি কাজ শেষ করার পরে তার মধ্যে ভুল থাকবেই। বারবার চেষ্টা করে তার উন্নতিসাধন করতে হবে। কেউই ভুলের উর্ধ্বে নয়! এখানে অনেক না বলা কথা থেকে যাবার পরও প্রসঙ্গক্রমে বলে রাখা দরকার যে, জুকারবার্গ ১৩ বছর বয়স থেকে ছিলেন এথিইস্ট(Atheist)। 

মার্ক জুকারবার্গের কাজের নীতি

লক্ষ্য অর্জনের  দিকে দৃষ্টি নিবদ্ধ কর বা লক্ষ্যভেদী হও! (Focus on Impact) 
গুরুত্বপূর্ণ সমস্যাসমূহ সমাধান করার জন্য পদক্ষেপ গ্রহণ করাটাই মূখ্য।  সাদামাটাভাবে বা আপাতদৃষ্টিতে কথাটি খুব সোজা! কিন্তু মার্ক জুকারবার্গের ভাষায়, কিন্তু আমরা দেখি প্রায় বেশিরভাগ কোম্পানীই এটি খুব দুর্বলভাবে করে থাকে এবং তারা অনেক সময় এতে ক্ষেপণ করে।


গতিই ধর্ম! (Move Fast)

দ্রুততালে কাজ করা মানে কিছু ভুল করা! এই বিষয়ের দিকে খেয়াল করে কাজ করার নীতি হচ্ছে মার্ক জুকার বার্গের নীতি।  কিছু ভঙ্গ না করলে আপনি সম্ভবত তেমন দ্রুতভাবে কর্তব্য পালন করছেন না!
তিনি বলছেন-

We have a saying: "Move fast and break things." The idea is that if you never break anything, you're probably not moving fast enough.

সাহসী হও! উদ্যমী হও!(Be Bold)

 বৃহৎ কিছু করা অথবা বলা যেতে পারে মহৎ কিছু করা মানেই তো ঝুঁকি নেয়া! সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ কাজ হচ্ছে কোনো ঝুঁকিই না নেয়া! 
এ যেন সমরবিদের কথা! নিষ্ক্রিয় প্রতিরক্ষা বলতে কিছু নেই! 

নিজেকে উন্মুক্ত উদার করে তোল! Be Open

 উন্মুক্ত পৃথিবীই সবথেকে ভালো পৃথিবী। জনগণের হাতে যতবেশি তথ্য থাকবে তারা ততো ভালো সিদ্ধান্ত নিতে পারবে এবং তাতে ফলাফলও আসবে ভালো। ফেসবুক ব্যবহারকারীরা যেন বেশি পরিমাণে তথ্য পায় তাই-ই লক্ষ্য।

সামাজিক মূল্যবোধের উন্নতি সাধন( Build Social Value)

লক্ষ্যটি শুধু একটি কোম্পানী গঠন করা নয়। বরং সামাজিক মূল্যবোধ সৃষ্টি করাও এর লক্ষ্য। 
জুকারবার্গ বলছেন- 
শুধু ব্যবসা করে মুনাফা অর্জন করা নয়, আমরা সবাই খেয়াল রাখি প্রতিদিনের কাজের মাধ্যমে আমরা কীভাবে সমাজব্যবস্থায় কোনো পরিবর্তন আনতে পারি, পৃথিবীকে কিছু দিতে পারি।(সূত্র: দৈনিক প্রথম আলো)
সংক্ষেপে মার্ক জুকারবার্গকে নিয়ে আমার এই লেখা।
জুকার বার্গকে আমরা সাদাচোখে একজন উদ্যোক্তা বা ব্যবসায়ী যায়-ই বলি না কেন, তিনি যে একটি জীবন দর্শন অনুসরণ করেন তা তার কথাটেই বোঝা যায়।
সেই জীবন দর্শন শুধু ব্যক্তিকে ঘিরে নয় এবং তা শুধু ব্যক্তিলাভের জন্য নয় এবং তা শুধু ব্যবসায়িক সমৃদ্ধির জন্য নয়।
তার জীবন দর্শনে সামাজিক মূল্যবোধ রয়েছে। রয়েছে সমাজের প্রতি দায়িত্ব ও মমত্ববোধ!
বয়সে অনেকের কাছে  অনুজ এই জুকার বার্গ  আমাদের চিন্তাকে মূল্যবোধকে কিছুটা স্বস্তি দি'ক এই প্রত্যাশা রেখেই লেখাটি লিখলাম।

প্রয়োজনীয় তথ্যসূত্র: 

১. উইকিপিডিয়া
২. গার্ডিয়ান.কো.ইউকে
৩. দ্য টেলিগ্রাফ
৪. প্রথম আলো


Wednesday, November 6, 2013

আন্তনিও গ্রামশি সম্পর্কে

আন্তনিও গ্রামশি। জন্ম ১৮৯১ সালের ২২ জানুয়ারি। জন্মস্থান ইতালীর সার্দানিয়া দ্বীপের গির্জা শহর আলেসে। পিতার নাম ফ্রান্সেসকো গ্রামশি। মাতা জিওসেপ্পিনা মারসিয়াস। পিতা একজন নিন্মপদস্থ কর্মচারী ছিলেন।
গ্রামশি ছিলেন পিতা মাতার সাত সন্তানের চতুর্থতম। 
গ্রামশির যখন চার বছর বয়স তখন এক দুর্ঘটনায় তার মেরুদন্ড কুঁজো হয়ে যায়। তবে অন্য তথ্যমতে তার টিউবারকুলোসিস রোগের কারণে পিঠ কুঁজো হয়ে যায়।  তার সারাজীবন কুঁজো হয়েই কাটাতে হয়। এজন্য তার উচ্চতা ৫ ফুটের কম ছিলো। 
গ্রামশির যখন ৮ বছর বয়স তখন তার পিতা ফ্রান্সেসকো গ্রামশি অর্থ তছরূপের অভিযোগে অভিযুক্ত হন। এবং তাকে কারাভোগ করতে হয়। এতে গ্রামশিকে স্কুল ছাড়তে হয়। এবং সংসার চালানোর জন্য কাজে নেমে পড়তে হয়। এ সময় তাকে প্রতিদিন গড়ে ১০ ঘন্টা পর্যন্ত কাজ করতে হয়েছে। তার পিতা ১৯০৪ সালে ছাড়া না পাওয়া পর্যন্ত তাকে এই কাজ করে যেতে হয়। 
গ্রামশির মাধ্যমিক শিক্ষা অর্জন করেন কালজিয়ারি অঞ্চলের একটি স্কুলে।
 ১৯১১ সালে তিনি তুরিন বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার জন্য স্কলারশিপ অর্জন করেন। এ সময় তিনি সাহিত্য, ইতিহাস, দর্শন ও ভাষাতত্ত্বে পড়াশুনা করেন। 
বিশ্ববিদ্যালয়ে থাকার সময় তিনি আন্তোনিও ল্যাব্রিওলা, রোডলফো মোনডলফো, জিওভান্নি জেন্টিল এবং বেনেদিত্তো ক্রোচের সংস্পর্শে আসেন।  তারা হেগেলের দাশনিক তত্ত্বের চর্চা করতেন। আন্তোনিও ল্যাব্রিওলা হেগেলের এই দর্শনের নাম দিয়েছিলেন  'ফিলজফি অব প্রাক্সিস'।

১৯১৩ সালের শেষদিকে ইতালীয়ান সোস্যালিস্ট পার্টিতে যুক্ত হন। ১৯১৪ সালে তিনি সমাজতান্ত্রিক ভাবধারার পত্রিকা গ্রিডো দেল পোপলো( Il Grido del Popolo ) তে লেখালেখি করা শুরু করেন। এতে তিনি পরিচিতি অর্জন করেন। পরে তিনি উক্ত পত্রিকার সম্পাদকের দায়িত্ব গ্রহণ করেন।
 আর্থিক দৈন্যতার কারণে ১৯১৫ সালের দিকে তাকে বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠ থেকে বিদায় নিতে হয়। 
১৯১৬ সালের দিকে তিনি সমাজতান্ত্রিক পার্টির মুখপত্র 'অভন্তি'(Avanti!,) এর সহ-সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পান। 
১৯১৭ সালে ইতালীতে সমাজতান্ত্রিক অভ্যুত্থান সংঘটিত হলে তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভুমিকা রাখেন। 
১৯১৯ সালের এপ্রিলে তিনি তোগলিয়াত্তি, এনজেলো টাসকা এবং উমবারটো এই তিনজনের সাথে মিলে  দ্য নিউ অর্ডার নামে একটি প্রকাশনা বের করেন। এসসময় অক্টোবরের দিকে ইতালীর সমাজতান্ত্রিক দলে নানা উপদল দেখা দেয়। তবে একটি অংশ তৃতীয় আন্তর্জাতিকের সাথে যোগ দেয়। গ্রামশি সেই দলে ছিলেন।
১৯১৯-২০ সালের শ্রমিক ধর্মঘটের সময় গ্রামশি শ্রমিক কাউন্সিল গঠন করেন। এবং এই কাউন্সিলের মাধ্যমে কারখানার উৎপাদন নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করেন। তবে এই উদ্যোগ ব্যর্থ হয়। 

কারখানায় গঠিত শ্রমিক কাউন্সিল সম্পর্কে তিনি বলেন- একটি কারখানার সমস্ত শ্রমিক কমিশার বা প্রতিনিধিদের নির্বাচিত করবে। এবং এই কমিশারদের থেকেই নতুন কার্য নির্বাহী কমিটি মনোনীত করা হবে। এই কমিটির তিনটি কর্তব্য থাকবে। সেগুলো হলো-
১. শ্রমিকদের অধিকার রক্ষা করা। 
২. শ্রমিকদের রাজনৈতিক বা অধিকার সম্পর্কে ধারণা বা  শিক্ষার ব্যবস্থা করা। উপকারী প্রযুক্তিগত উদ্ভাবনকে কাজে লাগানোর বা ব্যবহারের উদ্যোগ নেয়া। 


 এ সময় তিনি সংসদীয় প্রথার বিরোধীর আমেদিও বোরদিগার সাথে মৈত্রী গঠন করেন। এবং ১৯২১ সালের ২১ জানুয়ারি গঠন করেন কমিউনিস্ট পার্টি অব ইতালী(PCI)।কিন্তু আমেদিও বোরদিগার সাথে তার মতের অমিল দেখা দেয়। 

১৯২২ সালে তিনি রাশিয়ায় যান। সেখানে ভায়োলিন বাদিকা Julia Schucht এর সাথে তিনি পরিচিত হন। পরে ১৯২৩ সালের দিকে তারা বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন। তাদের দেলিও এবং জিওলিয়ানো নামে দুই সন্তান হয়।
রাশিয়ায় গ্রামশি দুই বছর কাটান বলে জানা যায়। 
তিনি যখন রাশিয়ায় ছিলেন তখন ইতালীতে ফ্যাসিস্ট বেনিতো মুসোলিনি  ক্ষমতায় আসেন। তিনি ক্ষমতা গ্রহণের পর থেকেই ভিন্নমতের দল সংগঠন বা পার্টির উপর নিপীড়ন চালান। এসময় ইতালীর কমিউনিস্ট পার্টির অনেককেই তিনি জেলে পুরেন। বোরদিগাও এ সময় আটক হন।
এমন পরিস্থিতিতে তিনি ১৯২৩ সালের শেষের দিকে রাশিয়া থেকে অস্ট্রিয়ার ভিয়েনায় আসেন। এবং ১৯২৪ সালে তাকে ইতালীর কমিউনিস্ট পার্টির প্রধান নিযুক্ত করা হয়। রোমে এসে তিনি পার্টির নতুন মুখপত্র 'ইউনিটি(L'Unità) প্রকাশ করেন। 
১৯২৬ সালের জানুয়ারিতে লিয়নস  শহরে পার্টির কংগ্রেসে তিনি যুক্তফ্রন্ট গঠনের প্রস্তাব করেন এবং তার এই প্রস্তাব কংগ্রেসে গৃহীত হয়।
১৯২৬ সালের নভেম্বরে ইতালীর মুসোলিনী সরকার দেশে জরুরী আইন জারি করে। এবং গ্রামশিকে ঐ মাসের ৮ নভেম্বর গ্রেপ্তার করে। তাকে ৫ বছরের সাজা দিয়ে উসটিকা(Ustica ) নামে এক দ্বীপে নির্বাসন দেয়া হয়। সেখানে থাকার সময় তাকে নতুনভাবে ২০ বছরের সাজা দেয়া হয়। 
তাকে সাজা প্রদানের সময় তার বিরুদ্ধে মামলা প্রদানকারী বা প্রসিকিউটর বলেন- আগামী বিশ বছরের জন্য আমাদের অবশ্যই এই (গ্রামশির) মেধার কর্যকারিতাকে থামিয়ে দিতে হবে (For twenty years we must stop this brain from functioning)। 
১৯৩২ সাল থেকেই তার স্বাস্থ্যের অবনতি ঘটতে থাকে। এবং স্বাস্থ্যগত কারণে শর্তসাপেক্ষে তিনি মুক্তি পান। 
১৯৩৭ সালের ২৭ এপ্রিল ৪৬ বছর বয়সে রোমের কুইসিসানা হাসপাতালে তিনি বন্দী অবস্থায় মৃত্যুবরণ করেন। 
জেলে থাকার সময় তিনি ৩০টি নোটবুকে প্রায় ৩ হাজার পৃষ্ঠার মতো লেখা লিখে যান। পরে তার এই লেখাসমূহ প্রিজন নোটবুকস নামে  প্রকাশিত হয়।

গ্রামশির অবদান: 

মার্ক্সীয় রাজনীতিতে এখনো গ্রামশির অনেক মতবাদকে অনেকে অনসরণীয় মনে করে থাকেন।
নিচে গ্রামশির কিছু তাত্ত্বিক আলোচনাকে সংক্ষেপে উল্লেখ করা হলো-

রাষ্ট্রব্যবস্থা টিকে থাকা সম্পর্কে তিনি বলেছেন- সামাজিক কর্তৃত্ব বা আধিপত্য প্রতিষ্ঠা এবং জনগণের স্বেচ্ছাপ্রণোদিত সম্মতির ভিত্তিতেই রাষ্ট্রব্যবস্থা টিকে থাকে।

অত্যাচারী রাষ্ট্রব্যবস্থার ভিতটিকে টলানোর কাজটিকেও তিনি এই ভিত্তি বা কর্তৃত্ব বা আধিপত্য ভাঙার প্রচেষ্টা বা উদ্যোগ নেয়ার উপরই গুরুত্ব প্রদান করেছেন।
তার অভিমত, এই আধিপত্যকে ভাঙতে হলে সাংস্কৃতিক আধিপত্য বা কালচারাল হেজিমনি সৃষ্টি হবে। 
তার মতে,  বর্তমান পরিস্থিতি বা অবস্থায় নিজস্ব সংকীর্ণ অর্থনৈতিক স্বার্থ নিয়ে অগ্রসর হয়ে  একটি শ্রেনী তার আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করতে পারে না। এবং শুধুমাত্র শক্তি প্রদর্শন বা দমন নির্যাতনের মাধ্যমেও এই আধিপত্য বজায় রাখা সম্ভব নয়। বরঞ্চ, শ্রেনী আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করতে হলে অবশ্যই বৌদ্ধিক এবং নৈতিক নেতৃত্বকে প্রয়োগ করতে হবে এবং বিভিন্ন শক্তির সাথে মৈত্রী ও সহযোগিতা করে এগোতে হবে।  

তিনি আরো বলেছেন, সাধারণভাবে সকলেই ইন্টেলেকচুয়াল বা যুক্তিজ্ঞানসম্পন্ন এবং সকলেরই যুক্তিবোধ ও বিচারবোধ থাকে। তবে সকলেরই সামাজিকভাবে কার্যকরী যুক্তিবোধ থাকে না। 
“All men are intellectuals, but not all men have in society the function of intellectuals”
Antonio Gramsci, Selections from the Prison Notebooks of Antonio Gramsci
 পার্টি বিষয়ে তিনি বলেছেন, তিনটি বিষয় একটি পার্টিকে পূর্ণতা দান করে। এগুলো হলো- একটি দার্শনিক মতবাদ, সুদক্ষ কর্মী বা কর্মীসমষ্টি এবং প্রকৃত ঐতিহাসিক আন্দোলন। পার্টি কাঠামোতে তিনটি বিষয় অপরিহার্য। এগুলো হলো- সাধারণ কর্মী, ক্যাডার ও নেতৃত্ব।

লেখাটি এখনো অসম্পূর্ণ। নতুন তথ্য যখনই পাবো তখনই তা যোগ করার আশা রাখছি...
ধন্যবাদ

প্রয়োজনীয় তথ্যসূত্র: 

১. উইকিপিডিয়া
২. মার্ক্সিস্টস.অর্গ
৩. umich.edu
৪. গ্রামশি চিন্তা- সোশোভন সরকার
৫. গ্রামশি জীবন ও চিন্তা- নরহারি কবিরাজ সম্পাদিত।
৬. ইনফেড.অর্গ
৭. ইন্টারন্যাশনাল গ্রামশি সোসাইটি




সর্বাধিক পঠিত

ইতিহাসের ভ্রান্তি থেকে বিভ্রান্তিকর শিক্ষাঃ পার্বত্য চট্টগ্রাম প্রসংগ-১৯৪৭ সাল

ইতিহাসের ভ্রান্তি থেকে বিভ্রান্তিকর শিক্ষা তারিখঃ ১৬ আগস্ট, ২০১৭ ইতিহাস একটি জাতি বা জাতিসত্তা তথা জাতিসমষ্টিকে নানাভাবে প্রভাবিত কর...